
প্রাচীনকালের ইতিহাস থেকে শুরু করে একবিংশ শতক পর্যন্ত বাংলার জয়জয়কার এখনও শুধু ভারতে নয়, গোটা বিশ্বেই বজায় রয়েছে। শিক্ষা থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, কৃষ্টির মতো ক্ষেত্রে বাঙালির নাম ভারতে আজও সর্বাগ্রে সমাদৃত হয়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে, আর্থিক ভাবে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও, আদতে এই বাংলাই ছিল ভারতের রাজধানী। ফলে গোটা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিশ্বাস করে বাংলা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কবির কথা একটু বদলে বলাই যায় বাংলা আবার ভারত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।
আর সেই শ্রেষ্ঠ হওয়ার পথে বাংলাকে সাহায্য করতে পারে, বঙ্গভূমিরই মাটি। আদতে আরও খোলসা করে বললে পশ্চিমবঙ্গের বিশাল খনিজ ভান্ডার। সম্প্রতি জানা গিয়েছে, এই বাংলার মাটির নীচেই লুকিয়ে রয়েছে কোটি কোটি টাকার খনিজ ভাণ্ডার। গত কয়েক বছরের মধ্যেই বারেবারে সংবাদ শিরোনামে এসেছে অশোকনগরের অপরিশোধিত তেল। সম্প্রতি সেই তেল তোলাও শুরু হয়েছে। আর অন্যদিকে পুরুলিয়ায় খোঁজ মিলেছে রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল অর্থাৎ বিরল খনিজের। পাশাপাশি, ঝাড়গ্রামে ম্যাঙ্গানিজের সন্ধান ঘিরেও জল্পনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া, পশ্চিমবঙ্গের সুপ্রাচীন কয়লা, ফায়ার ক্লে তো এই তালিকায় রয়েছে বহু আগে থেকেই।
উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোকনগরের বাইগাছিতে ONGC-র উদ্যোগে বাণিজ্যিক ভাবে খনিজ তেল উত্তোলন শুরু হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রথম এই তেলক্ষেত্রটি আবিষ্কার করে ONGC। এরপর দীর্ঘ কয়েকবছর প্রক্রিয়া চালানোর পর ২৮ অগাস্টে প্রথম বাণিজ্যিক ভাবে তেল উত্তোলন শুরু হয়েছে। এটি পশ্চিমবঙ্গ তথা পূর্ব ভারতের প্রথম খনিজ তেলের খনি। যা অদূর ভবিষ্যতে গোটা পশ্চিমবঙ্গের, বিশেষ করে ওই এলাকার আর্থিক নকশা বদলে দিতে পারে। অশোকনগর কেন্দ্রে এখন মোট ৬টি কূপ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি খনিজ তেলের জন্য। বাকি দু’টি প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য।
খনিজ তেলের সন্ধান পাওয়ার ফলে ওই এলাকায় পরিকাঠোমারও হু হু করে উন্নতি হচ্ছে। পাশাপাশি অশোকনগরের স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছে ONGC। সব মিলিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার ওই অংশের মানুষের ভাগ্য বদলে দেবে এই তরল রত্ন।
সম্প্রতি, GSI অর্থাৎ জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এবং AMD অর্থাৎ অ্যাটমিক মিনারেলস ডিরেক্টরেটের যৌথ ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে রঘুনাথপুর হয়ে বাঁকুড়ার ছাতনা ও পুরুলিয়ার কাশীপুর পর্যন্ত একাধিক এলাকায় খোঁজ মিলেছে বিরল খনিজ উপাদানের।
সম্প্রতি বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য সংসদে জানিয়েছেন, পুরুলিয়ার একটি ব্লকেই ১.৭৮ লক্ষ টন আকরিকের খোঁজ মিলেছে। যার মধ্যে রয়েছে ০.৪% সিজিয়াম, ০.৩% লিথিয়াম ও ০.০১% রুবিডিয়াম। ওই এলাকা ইতিমধ্যেই নিলামের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। রেলপথ ও রাঁচি বিমানবন্দরের কাছে হওয়ায় এটি অর্থনৈতিক ভাবেও অত্যন্ত লাভজনক। পাশাপাশি পুরুলিয়া-বাঁকুড়ায় ১০টি দুর্লভ খনিজ প্রকল্প গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে এবং জিএসআই জি-২ স্তরের উন্নত অনুসন্ধান শুরু করেছে। এছাড়াও, পুরুলিয়ার কালাপাথর-রঘুডি অঞ্চলে ল্যান্থানাইড ও ইট্রিয়াম সমেত ১৬টি ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে, যেখানে প্রায় ৬.৭০ লক্ষ টন প্রাচুর্যময় খনিজ ভাণ্ডার রয়েছে।
এই বিরল খনিজ আসলে ৭টি ধাতব মৌলের একটি বিশেষ গোষ্ঠী। এই রেয়ার আর্থ মেটেরিয়াল উত্তোলন করা সম্ভব বলে বাংলার আর্থিক ভাগ্য চিরতরে বদলে যেতে পারে। বহু পরিমাণ রাজস্ব বাড়বে রাজ্য সরকারের। যা বাংলাবাসীর ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
ঝাড়গ্রামে ম্যাঙ্গানিজের সন্ধান ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য ম্যাঙ্গানিজ সমৃদ্ধ এলাকাগুলিতে যৌথ রিকনাইস্যান্স সার্ভের অনুমোদন দিয়েছে রাজ্য সরকার। ১৯ অগস্ট ২০২৬ তারিখের একটি চিঠিতে এই সমীক্ষার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ম্যাঙ্গানিজের সম্ভাবনা রয়েছে এমন এলাকাগুলিতে এই সমীক্ষা চালানো হবে।
সিমুলপাল, লাবণী, ভাণ্ডারচুয়া, পঞ্চাশ ফুট খদান, চাউগা পাহাড়, হাসা ডুংরি, চৌকিসাল পাহাড়, কারকা, বেগুন্ডিহা, বীরমণ্ডল এবং বাঁশপাহাড়ি এলাকায় এই সমীক্ষা চলবে বলে সূত্রের খবর। প্রস্তাবিত প্রাথমিক পর্যায়ের সমীক্ষা চলবে ১৫ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। এই যৌথ তদন্তে MOIL-এর পাশাপাশি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (GSI), ইন্ডিয়ান ব্যুরো অফ মাইনস (IBM), ডিরেক্টরেট অফ মাইনস অ্যান্ড মিনারেলস (DMM) এবং WBMDTCL-এর প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন বলে জানা গিয়েছে। তবে এই অনুমোদনকে এখনও ম্যাঙ্গানিজ খননের অনুমতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি প্রাথমিক পর্যায়ের সমীক্ষা মাত্র।