
বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়াচ্ছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, আগামী কয়েক ঘণ্টায় আরও শক্তি বাড়িয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে অর্ণব। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর তা অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় রূপে আত্মপ্রকাশ করবে। বুধবার, ২৮ অক্টোবর সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের কাছে পৌঁছে দুপুরের মধ্যে স্থলভাগ অতিক্রম করতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড়টির সরাসরি আছড়ে পড়ার সম্ভাবনা অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে থাকলেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে পশ্চিমবঙ্গেও।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। কিছু জেলায় ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জেলাগুলিতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে হাওয়া অফিস।
ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের সোমবারের বুলেটিন অনুযায়ী, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরের উপর অবস্থান করছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। সোমবার সকালে ঘূর্ণিঝড়টির অবস্থান ছিল প্রায় ১৫.৪ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৮.৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের কাছে। গত ছ'ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার গতিতে পশ্চিম দিকে এগিয়েছে সেটি। এরপর পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে শক্তি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে অর্ণবের। সোমবার মধ্যরাতের মধ্যে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে এবং মঙ্গলবার অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে এই ব্যবস্থা।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার, ২৮ অক্টোবর সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূলের কাছে পৌঁছতে পারে অর্ণব। বাপতলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যে, ইয়ানামের কাছাকাছি উপকূল অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময় ঘূর্ণিঝড়টির সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার থাকতে পারে। দমকা হাওয়ার বেগ পৌঁছতে পারে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ফলে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল এবং দক্ষিণ ওড়িশায় ঝড়-বৃষ্টি ও সমুদ্র উত্তাল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। স্থলভাগ অতিক্রমের পর ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে।
অর্ণবের প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গে সরাসরি ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ার পূর্বাভাস নেই। তবে উপকূলবর্তী এলাকায় দমকা হাওয়া এবং দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকায় ঘণ্টায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। সমুদ্রও উত্তাল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণে মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে মৎস্যজীবীদের।
অর্ণবের প্রভাবে মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হাওড়া ও হুগলির কিছু এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি এবং ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে হাওয়ার দাপট তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি এবং উত্তর ২৪ পরগনার কিছু জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে।
বুধবার, ২৮ অক্টোবর দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ার আরও অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ ৭০ থেকে ১১০ মিলিমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই জেলাগুলিতে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। উপকূলবর্তী এলাকায় সমুদ্র উত্তাল থাকার আশঙ্কা থাকায় মৎস্যজীবীদের সতর্ক থাকতে হবে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি এবং ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বৃষ্টি চলতে পারে। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও পশ্চিম বর্ধমানে বিভিন্ন জায়গায় হালকা থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং দুই মেদিনীপুরে ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদেও বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হতে পারে। কোনও কোনও এলাকায় বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া বইতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগ অতিক্রম করার পর দুর্বল হয়ে এগোলেও তার প্রভাবে রাজ্যের আবহাওয়ায় পরিবর্তন বজায় থাকতে পারে।
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর দক্ষিণবঙ্গের বৃষ্টির তীব্রতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকছে। মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমানের কিছু এলাকায় ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও হালকা বৃষ্টি হতে পারে। উপকূলবর্তী এলাকায় আবহাওয়ার পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে হবে।
উত্তরবঙ্গেও অর্ণবের পরোক্ষ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি শুরু হতে পারে। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ারে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে শুক্রবার পর্যন্ত। পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির কারণে স্থানীয় পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে। শনিবার, ৩১ অক্টোবর উত্তরবঙ্গের সব জেলাতেই বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলায় বৃষ্টির পরিমাণ ও তীব্রতা এক রকম হবে না।
ফলে অর্ণবের সরাসরি প্রভাব অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল ও দক্ষিণ ওড়িশায় পড়ার সম্ভাবনা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গেও কয়েক দিন আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে পারে। বিশেষ করে মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে ঝোড়ো হাওয়া এবং বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যাওয়ার আগে সরকারি সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া দফতর।