
আরও এগিয়ে এল ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। শক্তি বাড়িয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি। বুধবার, ২৮ অক্টোবর সকালে অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মাঝামাঝি উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে অর্ণব। সেই সময় ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার হতে পারে, দমকা হাওয়ার বেগ পৌঁছতে পারে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটারে।
তবে অর্ণবের সরাসরি আছড়ে পড়ার আশঙ্কা বাংলায় না থাকলেও তার প্রভাবে দুর্যোগের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে পশ্চিমবঙ্গেও। ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর। উপকূলবর্তী এলাকায় বইতে পারে ঝোড়ো হাওয়া, সমুদ্রও থাকবে উত্তাল। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। কোন কোন জেলায় বৃষ্টি হবে? কতটা প্রভাব পড়বে কলকাতায়? কী বলছে আবহাওয়া দফতরের সর্বশেষ বুলেটিন?
আবহাওয়া দফতরের বুলেটিনে জানানো হয়েছে, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে পরে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ঘূর্ণিঝড়টির। ২৮ অক্টোবর সকাল নাগাদ অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূলের মধ্যে, বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী এলাকায় ইয়ানামের কাছ দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করতে পারে সেটি।
স্থলভাগে আছড়ে পড়ার সময় ঘূর্ণিঝড়টির সর্বোচ্চ স্থায়ী বায়ুর গতিবেগ ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার থাকতে পারে। দমকা হাওয়ার গতিবেগ পৌঁছতে পারে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত। আজ সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়ের সর্বোচ্চ স্থায়ী বায়ুর গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছনোর পূর্বাভাস রয়েছে।
স্থলভাগে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে শক্তি হারাবে অর্ণব। ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমে ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১০০ কিলোমিটার হতে পারে। ২৯ অক্টোবর সকালে সেটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ৩০ অক্টোবরের মধ্যে আরও দুর্বল হয়ে সুস্পষ্ট নিম্নচাপ অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
বাংলায় কবে থেকে বৃষ্টি? কী বলছে আবহাওয়া দফতর?
বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাজ্যের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। আইএমডি-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের কাছাকাছি দমকা হাওয়া বইতে পারে। ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে রাজ্যের কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও ঝোড়ো হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। বিশেষ করে উপকূলবর্তী জেলাগুলিতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২৮ অক্টোবর: দক্ষিণবঙ্গের কোন কোন জেলায় বৃষ্টি?
২৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, কলকাতা এবং হাওড়ার কয়েকটি জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অথবা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতে এক-দু'টি জায়গায় হালকা বৃষ্টি হতে পারে।
এই জেলাগুলির এক-দু'টি জায়গায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার গতিবেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে।
২৯ অক্টোবর: উপকূল ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা
২৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ২৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের সমস্ত জেলায় অনেক জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সময় দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামের এক-দু'টি জায়গায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের এক-দু'টি জায়গায় ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝোড়ো হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩০ অক্টোবর: ফের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস
২৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৩০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং পশ্চিম বর্ধমানের অধিকাংশ জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলির অনেক জায়গাতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া এবং পশ্চিম বর্ধমানের এক-দু'টি জায়গায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের এক-দু'টি জায়গায় ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিবেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে। অন্য জেলাগুলিতেও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা রয়েছে।
৩১ অক্টোবর দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে হালকা বৃষ্টি হতে পারে। ১ থেকে ৩ নভেম্বরের মধ্যে এক-দু'টি জায়গায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টি, পাহাড়ে ধসের আশঙ্কা
ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে উত্তরবঙ্গেও আবহাওয়ার পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে মূলত শুষ্ক আবহাওয়া থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ২৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ২৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে উত্তরবঙ্গের সমস্ত জেলায় কয়েকটি জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অথবা বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি হতে পারে।
২৯ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৩০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের সমস্ত জেলায় অনেক জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির এক-দু'টি জায়গায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে উত্তরবঙ্গের সমস্ত জেলাতেই এক-দু'টি জায়গায় ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার গতিবেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে।
৩০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৩১ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং এবং আলিপুরদুয়ারের এক-দু'টি জায়গায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলাতেও বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে ধস নামার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। নিচু এলাকায় জল জমতে পারে। ফলে পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সমুদ্র উত্তাল, মৎস্যজীবীদের জন্য সতর্কতা
ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রের পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তাল থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। ২৮ অক্টোবর সকালে ঘূর্ণিঝড়ের স্থলভাগে প্রবেশের আগে পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। তার পরে ধীরে ধীরে সমুদ্রের পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের কাছে ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সমুদ্র উত্তাল থেকে অতি উত্তাল থাকতে পারে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা উপকূল এবং পশ্চিম-মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে মৎস্যজীবীদের ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সমুদ্রে যেতে নিষেধ করেছে আবহাওয়া দফতর।
কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরে স্থানীয় সতর্কতা সংকেত ৩ জারি করা হয়েছে। সাগরদ্বীপ বন্দরে জারি রয়েছে দ্বিতীয় পর্যায়ের বিভাগীয় সংকেত।
কী কী সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন?
ঘূর্ণিঝড়টি অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়লেও তার প্রভাবে বাংলার বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং ঝোড়ো হাওয়া হতে পারে। তাই কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে আবহাওয়া দফতর।
যেমন, বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সময় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হবে। খোলা মাঠে থাকা এবং গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে আশ্রয় নেওয়া এড়িয়ে চলতে হবে। জলাশয়ের কাছে থাকা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিচু এলাকায় সাময়িক জল জমার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রাস্তায় চলাচলের সময় সতর্ক থাকতে হবে। উপকূলবর্তী এলাকায় সমুদ্রসৈকতে যাওয়া এবং বিনোদনমূলক জলক্রীড়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টির সময় ধসের আশঙ্কা মাথায় রেখে যাতায়াত করতে হবে।