
সংখ্যালঘু ভোট আর পুরোপুরি তৃণমূলের পাশে নেই। বিধানসভা নির্বাচনের ফলেই তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফলতা উপনির্বাচনও সেই একই সমীকরণের পুনরাবৃত্তি, মত বিশ্লেষকদের। বিজেপির বিপুল জয় কার্যত অনিবার্য ছিল। কিন্তু তার থেকেও লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হল বামেদের পুনরুত্থান। এ যেন এক নতুন ফর্মুলায় এগোচ্ছে রাজ্য রাজনীতির অঙ্ক।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই কেন্দ্র বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটার। বাকি মূলত হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক। এত দিন এই ধরনের আসনে তৃণমূল অ্যাডভান্টেজে থাকত। কারণ, মুসলিম ভোটের বড় অংশ ঘাসফুল শিবিরের দিকে যেত। তার সঙ্গে হিন্দু ভোটের একটা অংশ পেলেই জয় নিশ্চিত।
কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর সেটা বদলে গিয়েছে। মুসলিম মেরুকরণের পাল্টা হিন্দু মেরুকরণ হচ্ছে বলে ধারণা রাজনৈতিক মহলের। তৃণমূল ক্ষমতা হারানোর পর, সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি খুঁজছেন। এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলতার ফল সেই জল্পনাকেই আরও উসকে দিল।
তৃণমূলের অনুপস্থিতিই কি এর কারণ?
এই উপনির্বাচনে তৃণমূল কার্যত মাঠেই নামেনি। প্রার্থী জাহাঙ্গির খান ভোটের আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেন। তৃণমূলের অন্দরে সমর্থনের অভাব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ফলে বিজেপির জয় প্রায় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু বাকি বিজেপি-বিরোধী ভোট কোথায় যাবে, তা নিয়েই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল।
সেই জায়গাতেই চমক। বাম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুড়মি দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটের উল্লেখযোগ্য অংশ এ বার সিপিএমের দিকে গিয়েছে। কংগ্রেসও কিছু ভোট পেয়েছে। চার নম্বরে TMC। ফলে মুসলিম ভোট একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়েছে বলেই ইঙ্গিত মিলছে।
| দল | প্রার্থী | প্রাপ্ত ভোট | ভোট শতাংশ |
|---|---|---|---|
| বিজেপি | দেবাংশু পণ্ডা | ১,৪৯,৬৬৬ | ৭১.২০% |
| সিপিএম | শম্ভুনাথ কুড়মি | ৪০,৬৪৫ | ১৯.৩৪% |
| কংগ্রেস | আব্দুর রেজ্জাক মোল্লা | ১০,০৮৪ | ৪.৮০% |
| তৃণমূল | জাহাঙ্গির খান | ৭,৭৮৩ | ৩.৭০% |
সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুড়মি আবার হিন্দু অনগ্রসর শ্রেণি থেকে উঠে আসা নেতা। দীর্ঘ দিন দলের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। বাম নেতৃত্বের দাবি, মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। সেই ক্ষোভের প্রতিফলনই দেখা গিয়েছে ভোটে।
বিজেপির দাবি vs. তৃণমূলের ব্যাখ্যা
বিজেপি অবশ্য এই ফলকে সরাসরি জনসমর্থনের প্রতিফলন বলছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভোটের ফল প্রকাশের পর দাবি করেন, 'বহু বছর পরে মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছেন'। তাঁর দাবি, অতীতে এই কেন্দ্রে ভয় দেখিয়ে ভোট করানো হত।
বিজেপি নেতা অমিত মালব্যের দাবি, ফলতা প্রমাণ করেছে ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ বিজেপিকে সমর্থন করেছে।
তৃণমূল অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। কুণাল ঘোষের দাবি, একটি উপনির্বাচনের ফল দেখে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। বিজেপিকে আটকাতে এখনও তৃণমূলই প্রধান শক্তি বলেও দাবি তাঁর।
ফলতার ফল কি কোনও বড় রাজনৈতিক বার্তা?
২০০৮ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু ভোট বামেদের ছেড়ে তৃণমূলের দিকে গিয়েছিল। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের পিছনেও এই ভোটব্যাঙ্ক বড় ভূমিকা নিয়েছিল। গত দেড় দশক ধরে সেই সমীকরণ প্রায় অটুট ছিল।
কিন্তু এ বারের বিধানসভা ভোটে বিভিন্ন জায়গায় সেই ভোটে ভাঙনের ইঙ্গিত মিলেছে। কোথাও সিপিএম, কোথাও কংগ্রেস, কোথাও আইএসএফ বা অন্য আঞ্চলিক শক্তি সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসিয়েছে।
ফলতার ফলাফল সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে বলে মত বিশ্লেষকদের একাংশের। তবে তাঁরা এ-ও বলছেন, তৃণমূল যদি পুরো শক্তি নিয়ে লড়ত, তা হলে ছবিটা অন্য রকমও হতে পারত।