
হুগলি নদী নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নয় তো জাহাজ চলাচল তো বন্ধ হবেই। পানীয় জলেরও সঙ্কট হতে পারে। এমনটাই মনে করছেন রাজ্যের জল সরবরাহ দফতরের ইঞ্জিনিয়াররা। আর মাস তিনেকের মধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা-পদ্মার জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনাও হচ্ছে। তবে আগের থেকে হুগলি নদীতে জলের পরিমাণ বেশি থাকা প্রয়োজন, মত আধিকারিকদের।
গঙ্গার সঙ্গে পানীয় জলের সম্পর্ক কী?
জাহাজ, বন্দরের ব্যাপারটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু পানীয় জলের সমস্যা হবে কেন? রাজ্যের জল সরবরাহ দফতরের প্রাক্তন আধিকারিক প্রসেন বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, 'আজকাল বেশিরভাগ জায়গায় ভূগর্ভস্থ জল কমে গিয়েছে। তাই গত ১০ বছরে গঙ্গার জল তোলা, পরিশোধন ও সাপ্লাই নিয়ে KMDA প্রচুর কাজ করেছে। কিন্তু সেই জল সরবরাহই যদি ওঠা-নামা করে, তাহলে পুরো প্রকল্পটাই ভেস্তে যাবে। তাছাড়া জলের পরিমাণ যত কম, ততই পলি, দূষকের ঘনত্ব বাড়বে। সেটা পরিশোধনের প্রক্রিয়াও আরও জটিল হবে।'
ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের কাছে গিয়েছেন রাজ্যের আধিকারিকরা
গত মাসের শেষেই কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের একটি অভ্যন্তরীণ কমিটির সঙ্গে বৈঠকে বসেন রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরা। সেখানে গঙ্গা থেকে প্রাপ্ত পানীয় জলের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাছাড়া শিল্প-কলকারখানাতেও গঙ্গার জলের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। রাজ্যের তরফে একটি বিস্তারিত রিপোর্টও জমা দেওয়া হয়েছে।
ড্রাই সিজনে ফারাক্কায় জল নিয়ে চিন্তা
রাজ্যের মূল দাবি কী? খুব সহজভাবে বললে, শুষ্ক মরসুমে ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে পর্যাপ্ত জল ছাড়তে হবে। কারণ সেই ফ্লো কমে গেলে তার প্রভাব পড়বে হুগলি নদীর নাব্যতার উপরেও।
হুগলি নদীর নাব্যতা কমলে কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দর-এর জাহাজ চলাচলেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। এমনটাই আশঙ্কা ইঞ্জিনিয়ারদের।
মালদা, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়া নিয়ে উদ্বেগ
হঠাৎ জলপ্রবাহ কমে গেলে নদীর তীরভাগ অনেক দূরে সরে যায়। এর ফলে পাড় ভাঙতে শুরু করে। বিশেষ করে মোহনা থেকে দূরবর্তী এলাকায় এটি বেশি দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলপ্রবাহের ধরন বদলালে মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়ার মতো নদীতীরবর্তী জেলাগুলিতে সমস্যা বাড়তে পারে।
এমনিতেই এই জেলাগুলির বেশ কিছু এলাকায় প্রতি বছর নদীভাঙন হয়। আবার ঠিক এই একই কারণে বর্ষায় হঠাৎ জল বেড়ে গিয়ে বন্যার সমস্যা বাড়ছে। তাই নতুন চুক্তি করার সময় নদীভাঙন এবং বন্যার বিষয়টিকেও মাথায় রাখতে হবে। সারা বছর যাতে জলের সরবরাহ মোটামুটি একই পর্যায়ে ধরে রাখা যায়, সেই চেষ্টাই করতে হবে।
যৌথ নদী কমিশনের আলোচনার দাবি
নতুন চুক্তির কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন-এর আলোচনার পক্ষেও সওয়াল করেছে পশ্চিমবঙ্গ।
১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ফারাক্কায় ড্রাই সিজনে গঙ্গার জল ভাগের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেটি মেনে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নির্দিষ্ট সূত্র অনুযায়ী জল ভাগ করা হয়।
এবার সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে কী শর্ত থাকবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর জলপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহের কাজও চলছে। ফারাক্কা এবং বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে জলপ্রবাহ মাপার কাজের ডেটা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই ডেটাই ডিসেম্বরের পর কাজে লাগতে পারে।
অর্থাৎ, গঙ্গা-পদ্মা জলবণ্টন চুক্তির উপরেই অনেক কিছু নির্ভর করছে। রাজ্যের পানীয় জল, বন্দর, শিল্প, কৃষি জড়িয়ে। সমস্যার কথা কেন্দ্রকে জানিয়েই রেখেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নতুন চুক্তিতে শেষ পর্যন্ত কী শর্ত রাখা হয়, এখন সেদিকেই নজর সকলের।