
ডিটেনশন ক্যাম্পের নামে ভয়ে কাঁপছে অনুপ্রবেশকারীরা। ২০১৯ সালে NRC প্রক্রিয়ার পর দেশের প্রথম ডিটেনশন সেন্টারগুলি তৈরি হয় অসমে। এবার তা হোল্ডিং সেন্টার চালু হয়ে গেল বাংলাতেও। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য তৈরি এই ক্যাম্প। ভারতে অনুপ্রবেশকারীদের এখান থেকে 'ডিপোর্ট' করে পাঠানো হবে বাংলাদেশে। সোমবার প্রথমদিনই তিন জেলার তিনটি হোল্ডিং সেন্টারে ১৮ জন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে রাখা হয়েছে। এদের খুব শীঘ্রই বিএসএফের মাধ্যমে ‘ডিপোর্ট’ করা হবে। ডিটেনশন ক্যাম্পের নাম শুনলেই মানুষের মনে ভীতি কাজ করে। অনেকের ধারণা এখানে জেলের মতো বন্দি করে রাখা হয়, ভোগ করতে হয় যন্ত্রণা। সত্যিই কি তাই? কী হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে? দেখতেই বা কেমন? হোল্ডিং সেন্টার কী? জেলের থেকে কোন দিক দিয়ে আলাদা? সবটা জেনে নিন।
ডিটেনশন সেন্টার বা হোল্ডিং সেন্টার কী?
২০২৫ সালের ২ মে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নির্দেশ দিয়েছিল, সেটা মেনেই এবার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় রাজ্যের তরফেও। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আটক শিবির এই ডিটেনশন ক্যাম্প। যাদের ভারতের নাগরিকত্ব নেই, নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে তাদের আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন বা নিজের দেশে প্রত্যর্পণের আগে আটকে রাখা হয়। অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে কাউকে চিহ্নিত করা হলেই তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ওই হোল্ডিং সেন্টারে। তারপর বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
কেন্দ্রের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ‘অ-মুসলিম’ ছাড়া যারা এপারে এসেছেন, তারা সবাই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। যাদের কাছে এদেশে থাকার সঠিক নথি নেই তাদেরই এখানে আটক করে রাখা হয়।
ডিটেনশন সেন্টার ও হোল্ডিং সেন্টার দেখতে কেমন?
অসমের গোয়ালপাড়ায় দেশের প্রথম ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছিল। শুরুতে জেলেই তৈরি হয়, ফলে পৃথক ক্যাম্প তৈরি হয়। এরপর কোকড়াঝাড়, তেজপুর, জোরহাট, ডিব্রুগড়, সিলচরেও তৈরি হয় ডিটেনশন ক্যাম্প। যেখানে ডবল লেয়ারের ৬ ফুট ও ২০ ফুটের উঁচু দেওয়ালের লম্বা হল ঘর, ওপরে শেডের চাল। প্রায় ৩ হাজার অবৈধ নাগরিককে এখানে রাখার বন্দোবস্ত করা হয়। একটা হলে পর পর ডরমেটরির মতো বিছানা, নজরদারির জন্য একটি ওয়াচ টাওয়ার। শুধু তাই নয়, অসমে আরও যে ডিটেনশন ক্যাম্পগুলি তৈরি হয় তা কোনওটা টিনের তৈরি, কোনওটা আবার পাকা ৩-৪ তলা বিল্ডিং। যেখানে মহিলা ও পুরুষদের জন্য পৃথক ঘর, শৌচালয়। সকলের জন্য একটিই খাওয়ার ঘর থাকে। হাসপাতাল ও পড়ুয়াদের জন্য স্কুলও। বিদ্যুৎ ও জলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা হয়। এদের এই ক্যাম্পের বাইরে যাওয়ার অনুমতি থাকে না।
তবে বাংলায় অব্যবহৃত সরকারি ভবনকেই আপাতত হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। মালদা জেলার ইংলিশ বাজার শহরের চন্দন পার্ক এলাকায় একটি চালু হয়েছে। বর্তমানে এটি সমগ্র মালদা জেলায় এই ধরনের একমাত্র কেন্দ্র এবং রাজ্যে এই ধরনের প্রথম কেন্দ্র বলে জানা গেছে। রবিবার কেন্দ্রটি খোলার সময় প্রাথমিকভাবে নয়জনকে আনা হয়েছিল। এই নয়জন বাংলাদেশি নাগরিক বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে তিনজন মহিলা এবং ছয়জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু রয়েছে, অর্থাৎ তাদের বয়স ১৮ বছরের কম।
কতদিন রাখা হয় হোল্ডিং সেন্টারে?
হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন ও পরিচালনার সম্পূর্ণ ব্যয় দেবে রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রশাসনকে। নির্দেশিকা অনুসারে, অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশকারী সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের এই হোল্ডিং সেন্টারগুলিতে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত রাখা যেতে পারে। এই সময়ে, তাদের নাগরিকত্ব এবং নথি যাচাই করা হবে। নাগরিকত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন জেলাশাসক বা সমতুল্য পদমর্যাদার কোনও আধিকারিক। এদের ৩০ দিনের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই করে সেই তথ্য জমা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। সেই সময় পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হবে। অবৈধ প্রমাণিত হলে ব্ল্যাকলিস্ট করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে পুনরায় ভারতে প্রবেশ করতে না পারে। এরপর তাদের প্রত্যর্পণ করা হবে। তাদের পরিবহণের প্রাথমিক খরচ রাজ্য সরকার দেবে।
জেলের থেকে কোন কোন ক্ষেত্রে আলাদা হোল্ডিং সেন্টার?
হোল্ডিং সেন্টারে জেলের থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা মেলে। জেলে অপরাধীদের কয়েদ করে রাখা হয়। এখানে অবৈধ নাগরিকদের রাখা হয়। তাই জেলের সঙ্গে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।