
তৃণমূলের জোড়াফুল প্রতীক আপাতত কারও নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হোন বা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির, কোনও পক্ষই আসন্ন উপনির্বাচনে তৃণমূলের চেনা জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। এমনকী 'অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস' নামটিও আপাতত কোনও পক্ষ এককভাবে ব্যবহার করতে পারবে না। বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী নির্দেশে এমনটাই জানিয়ে দিল নির্বাচন কমিশন। ফলে ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে দুই শিবিরকেই নতুন নাম ও নতুন প্রতীক নিয়ে লড়তে হবে।
আপাতত কারও 'তৃণমূল' নয়
তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে দুই পক্ষের দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর আপাতত মাঝামাঝি পথেই হাঁটল নির্বাচন কমিশন। কমিশনের বক্তব্য, এই মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অন্য পক্ষ- কাউকেই 'আসল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। ফলে দুই পক্ষই দলটির সংরক্ষিত জোড়াফুল প্রতীক থেকে দূরে থাকবে।
তবে দুই শিবিরকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেওয়ার বিষয়টিও কমিশন বলেনি। নিজেদের জন্য আলাদা নাম বেছে নেওয়ার সময় চাইলে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের' সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের উল্লেখ করতে পারবে তারা। অর্থাৎ নামের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা থাকলেও মূল দলীয় নাম ও সংরক্ষিত প্রতীক আপাতত দুই পক্ষের কাছেই নিষিদ্ধ।
নতুন নাম, নতুন প্রতীক
এবার উপনির্বাচনে দুই পক্ষ কী নামে লড়বে, সেটিও কমিশনকে জানাতে হবে। নির্দেশ অনুযায়ী, দুই গোষ্ঠীকে নিজেদের জন্য তিনটি করে নামের বিকল্প দিতে হবে। পছন্দের ক্রমে সেই তিনটি নাম কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে। সেখান থেকে একটি নাম অনুমোদন করবে কমিশন।
শুধু নাম নয়, প্রতীকের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান উপনির্বাচনের জন্য বিজ্ঞাপিত 'ফ্রি সিম্বল'-এর তালিকা থেকে তিনটি করে প্রতীক পছন্দ করতে হবে দুই পক্ষকে। পছন্দের ক্রমে সেই তালিকা জমা দিতে হবে। কমিশন তার মধ্যে থেকে একটি প্রতীক বরাদ্দ করবে। এই নাম ও প্রতীকের পছন্দ জানানোর সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে কমিশন। ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার মধ্যে দুই পক্ষকে নিজেদের পছন্দ জানাতে হবে। অর্থাৎ হাতে কার্যত খুব বেশি সময় নেই।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি
কমিশন স্পষ্ট করেছে, এটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা। নির্বাচন প্রতীক সংক্রান্ত ১৯৬৮ সালের আদেশের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে মূল বিরোধ রয়েছে, তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও বাকি। অর্থাৎ এখনই কমিশন বলছে না যে মমতা শিবির বা বিদ্রোহী শিবিরের মধ্যে কে 'আসল তৃণমূল'। আপাতত দুই পক্ষকে সমান অবস্থানে রেখে উপনির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার লক্ষ্য।
দলীয় নাম, প্রতীক, সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দাবিদাওয়া নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য ও নথি খতিয়ে দেখার পর কমিশন পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
কোথা থেকে শুরু হল বিবাদ?
বিধানসভা নির্বাচনের ফলের পর তৃণমূলের অন্দরের সংঘাত প্রকাশ্যে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এক দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির নিজেদের তৃণমূলের বৈধ সংগঠন বলে দাবি করে। অন্য দিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীও নিজেদের সাংগঠনিক বৈধতার দাবি নিয়ে সামনে আসে।
দুই পক্ষের টানাপোড়েন শুধু পরিষদীয় দলের নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়েও পাল্টাপাল্টি দাবি উঠেছে। বিদ্রোহী শিবিরের তরফে নতুন জাতীয় কর্মসমিতি তৈরির দাবি করা হয়েছে। সেই কাঠামোয় অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান করা হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে প্রশ্ন ওঠে-দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে?
এর পরেই নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয় দুই পক্ষ। কমিশন একাধিক বার উভয় পক্ষের সঙ্গে শুনানি করেছে এবং প্রয়োজনীয় নথি চেয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর দুই গোষ্ঠীই কমিশনের কাছে নিজেদের বক্তব্য ও নথি পেশ করে। পরবর্তী সময়ে কমিশন মমতা শিবিরের কাছ থেকেও অতিরিক্ত জবাব চেয়েছিল।
জোড়াফুলের ভবিষ্যৎ কী?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রতীকটি তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে, সেটি আপাতত কমিশনের হেফাজতেই থাকছে। বিদ্রোহী শিবিরও সেই প্রতীক পেল না। তবে এর অর্থ এই নয় যে জোড়াফুল প্রতীক চিরতরে বাতিল হয়ে গেল বা কোনও পক্ষই আর তা পাবে না। কমিশনের বর্তমান নির্দেশ শুধুমাত্র আসন্ন উপনির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে কার্যকর হচ্ছে।