
রাজ্য সরকারের নির্দেশে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বহুতল আবাসন এবং বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধ। এর জেরে শহরের একের পর এক নির্মাণস্থল এখন কার্যত শ্রমিকশূন্য। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার আশঙ্কায় বহু শ্রমিক ইতিমধ্যেই নির্মাণস্থল ছেড়ে নিজ নিজ জেলায় বা অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছেন। ফলে ভবিষ্যতে কাজ শুরু হলেও তাঁদের ফেরানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলি।
নির্মাণ সংস্থাগুলির দাবি, দীর্ঘ সময় কর্মহীন বসে থাকার সামর্থ্য অধিকাংশ শ্রমিকের নেই। তাই অনেকে বেশি মজুরির আশায় ভিনরাজ্যে কাজের খোঁজে চলে যাচ্ছেন। আবার অনেকে কলকাতার কাছাকাছি হওয়ায় মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে কাজ করতে এসেছিলেন। তবে অন্যত্র কাজ পেয়ে গেলে তাঁদের ফেরানো সহজ হবে না বলেই মনে করছেন নির্মাতারা।
রাজ্য সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত জি+৫ বা তার বেশি উচ্চতার সমস্ত আবাসিক ভবন এবং সব ধরনের বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণকাজ স্থগিত থাকবে। এই সময় প্রতিটি প্রকল্পে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ‘সেফটি অডিট’ করা হবে। তবে জি+৫-এর নিচু আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
শনিবার দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতার ইএম বাইপাস সংলগ্ন একাধিক নির্মাণস্থলে খবর নিয়ে জানা যায়,, কোথাও কোনও শ্রমিক নেই। মুকুন্দপুরের ‘উতালিকা’-র পাশের একটি নির্মাণস্থলে কেবল নিরাপত্তারক্ষীরাই দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সেখানকার এক নিরাপত্তারক্ষী জানান, শুক্রবার পর্যন্ত শ্রমিকরা অপেক্ষা করেছিলেন, যদি নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। কিন্তু কাজ শিগগিরই শুরু হবে না বুঝতে পেরে শনিবার সকালে সবাই চলে গিয়েছেন।
উল্লেখ্য, তারাতলায় একটি নির্মীয়মাণ গুদাম ধসে ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার পরই রাজ্য সরকার এই কড়া পদক্ষেপ করে। ওই দুর্ঘটনার পর নিম্নমানের নির্মাণ এবং অনুমোদিত নকশা না মেনে কাজ করার অভিযোগ সামনে আসে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই নিরাপত্তা যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চক গড়িয়ার একটি ১২ তলা নির্মীয়মাণ বিল্ডিংয়েও একই ছবি দেখা গেছে। সেখানে কর্মরত এক ব্যক্তি জানান, সেখানে প্রায় আটজন শ্রমিক ছিলেন। কাজ বন্ধ হওয়ার পর শুক্রবারই তাঁরা চলে গেছেন। কাজ শুরুর অনুমতি মিললেই তাঁদের আবার ডাকা হবে।
কাছাকাছি আরও একটি নির্মাণ প্রকল্পে তালা ঝুলতে দেখা যায়। সেখানে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে সব ধরনের কাজ।
পুরসভার এক আধিকারিক জানিয়েছেন, প্রতিটি প্রকল্পের নিরাপত্তা অডিট আলাদাভাবে করা হবে। যেসব প্রকল্পে নির্মাণবিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছে এবং ৩১ জুলাইয়ের আগেই অডিট শেষ হবে, সেগুলিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্মাণকাজ ফের শুরু করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
এই নির্দেশ কলকাতা ছাড়াও নিউটাউন, বিধাননগর, রাজারহাট, সোনারপুর-রাজপুর, পূজালি, মহেশতলা, বজবজ, বরানগর, দক্ষিণ দমদম, কামারহাটি, বালির কিছু অংশ, হাওড়া পৌর এলাকার অংশবিশেষ এবং জোকার কাছে বিষ্ণুপুর গ্রামীণ এলাকাতেও কার্যকর রয়েছে।
রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলির মতে, দক্ষ নির্মাণ শ্রমিকদের ধরে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এক শীর্ষ কর্তা বলেন, “দক্ষ নির্মাণ শ্রমিকের সারা দেশেই চাহিদা রয়েছে। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ করানোর জন্য ঠিকাদাররা তাঁদের বিমানে করেও নিয়ে যান। একবার অন্যত্র কাজ পেয়ে গেলে তাঁদের ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন হয়ে যায়।”
নির্মাণ শিল্পে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। কেউ রড বাঁধার কাজে পারদর্শী, কেউ প্লাস্টার বা কংক্রিট তৈরির কাজে বিশেষ দক্ষ। ফলে এই শ্রমিকদের অভাব দেখা দিলে নির্মাণ শিল্পে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।