
তৃণমূলের 'বিদ্রোহী' সাংসদের নিয়ে চর্চা তুঙ্গে। ত্রিপুরার আঞ্চলিক দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া (NCPI)-র সঙ্গে যুক্ত হবেন তাঁরা। প্রশ্ন উঠছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কি দলত্যাগ-বিরোধী আইন বা অ্যান্টি-ডিফেকশন আইনের আওতায় পদক্ষেপ করা সম্ভব? নাকি সংখ্যার বলে তৃণমূলই হাতছাড়া হতে পারে মমতার?
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে সংবিধানের দশম তফসিল, অর্থাৎ দলত্যাগ-বিরোধী আইন। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে এই আইন চালু হয়েছিল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হঠাৎ ইচ্ছামতো দলবদল আটকানোই এর মূল উদ্দেশ্য ছিল।
এই আইন অনুযায়ী, কোনও সাংসদ বা বিধায়ক স্বেচ্ছায় দল ছাড়লে অথবা দলীয় হুইপ অমান্য করলে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আইনে পরিবর্তন এসেছে। এক সময়ে কোনও দলের এক-তৃতীয়াংশ সদস্য একসঙ্গে বেরিয়ে গেলে তা ‘স্প্লিট’ বা ভাঙন হিসেবে স্বীকৃতি পেত। সে ক্ষেত্রে দলত্যাগের অভিযোগ থেকে রেহাই মিলত।
কিন্তু ২০০৩ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে ৯১তম সংবিধান সংশোধন হয়। তাতে সেই নিয়ম বাতিল করা হয়। পরিবর্তে নতুন নিয়ম করা হয়। সেটা অনুযায়ী, কোনও গ্রুপ যদি মেন দল ছেড়ে অন্য দলে বৈধভাবে জুড়ে যেতে চায়(এখন যেটা হচ্ছে), তা হলে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ জনপ্রতিনিধির সমর্থন থাকতে হবে।
বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা ২৮। সেই হিসাবে দুই-তৃতীয়াংশ ১৯। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাঁদের সঙ্গে ২০ জন সাংসদ রয়েছেন। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের দাবি, আরও ২ জন সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে সংখ্যাটা ২২ হতে পারে। ফলে তাঁরা খাতায় কলমে নিয়ম বহির্ভূত কিছুই করছেন না। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যাবে না, বলছেন বিদ্রোহীরা।
এদিকে বিদ্রোহী সাংসদদের একাংশ ইতিমধ্যেই NCPI-র সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, পৃথক রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতেই এই পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে সংসদে নিজেদের অবস্থান এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তাঁরা স্পিকারের কাছেও আবেদন জানাতে পারেন।
তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। কারণ, সাংসদ পদ রক্ষা এবং কোনও দলের নাম বা প্রতীক ক্লেম করা; দু'টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কোনও দলের প্রকৃত উত্তরাধিকারী কে, তা নির্ধারণ করে নির্বাচন কমিশন।
ইতিহাস বলছে, কোনও রাজনৈতিক দলে ভাঙন দেখা দিলে উভয় পক্ষই নিজেদের 'আসল' দল বলে দাবি করে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাংগঠনিক কাঠামো এবং দলের অভ্যন্তরীণ সমর্থনের মতো একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়।
তৃণমূলের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্রোহী সাংসদদের সংখ্যা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। একইভাবে সংগঠনের উপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণও এখনও বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে আগামিদিনে এই রাজনৈতিক লড়াই নির্বাচন কমিশনের দরজা পর্যন্তও গড়াতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।