
বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, মূল অভিযুক্ত আনন্দ .সর্দার জেরায় স্বীকার করেছে যে সূর্যপুরের যে পুকুর থেকে নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়েছিল, তার পাশের ঘন ঝোপেই তাঁকে নিয়ে গিয়ে দফায় দফায় ধর্ষণ করা হয়।
তদন্তকারীদের মতে, পুকুর ও রেললাইনের মাঝখানে থাকা ওই নির্জন ঝোপঝাড় ছিল অভিযুক্তদের নিয়মিত নেশার আড্ডার জায়গা। সেখানেই পরিকল্পিতভাবে নাবালিকাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং ধর্ষণ ও খুন করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
ঝোপের আড়ালেই চলে নির্যাতন
পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রভাস নামে এক অভিযুক্ত নাবালিকার মুখ চেপে তাঁকে ঝোপের আড়ালে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল আনন্দ, দিবাকর এবং অন্যরা। তদন্তকারীদের দাবি, এরপর অভিযুক্তরা পালাক্রমে ওই নাবালিকাকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, নাবালিকা প্রবল প্রতিরোধের চেষ্টা করলে দিবাকর ও প্রভাস তাঁর হাত-পা চেপে ধরে এবং মুখ বন্ধ করে দেয়। এরপরও চিৎকারের চেষ্টা করায় তাঁর মাথায় বারবার আঘাত করা হয়। তদন্তকারীদের মতে, এই আঘাতই শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
ময়নাতদন্তে নৃশংসতার একাধিক প্রমাণ
পুলিশ ও ময়নাতদন্ত সূত্রের দাবি, নাবালিকার শরীরে নৃশংস নির্যাতনের একাধিক চিহ্ন মিলেছে। রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, ঠোঁট ও জিভে কামড়ের গুরুতর ক্ষত ছিল। গোপনাঙ্গের দু'পাশে একাধিক গভীর আঘাতের চিহ্ন এবং পেরিয়ানাল (মলদ্বারের আশপাশের) অংশেও গুরুতর ক্ষত পাওয়া গেছে। পুলিশ ও মর্গ সূত্রে জানা যাচ্ছে, গণধর্ষণের সময় তার ঠোঁট ও জিভ কামড়ে প্রায় ছিঁড়ে নিয়েছে দুষ্কৃতীরা।
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে মাথায় ভারী আঘাতকে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ফুসফুস ও পাকস্থলীতে জল পাওয়া যাওয়ায় চিকিৎসকদের ধারণা, পুকুরে ফেলে দেওয়ার সময়ও নাবালিকা জীবিত ছিল। রিপোর্টে মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ হিসেবে 'অ্যান্টিমর্টেম ড্রাউনিং' (মৃত্যুর আগে জলে ডুবে যাওয়া)-এর উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া পাকস্থলী থেকে উদ্ধার হওয়া খাদ্যাংশ পরীক্ষা করে মৃত্যুর সঠিক সময় নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
প্রমাণ লোপাটের পরিকল্পনার অভিযোগ
পুলিশের দাবি, জেরায় আনন্দ জানিয়েছে যে নাবালিকাকে জীবিত অবস্থায় ছেড়ে দিলে তারা ধরা পড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করেছিল। সেই কারণেই তাকে হত্যা করে পুকুরে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তদন্তকারীদের আরও দাবি, অভিযুক্তদের পরিকল্পনা ছিল দেহ জলে ভেসে উঠলে ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত ডুবে মৃত্যু বলে মনে হবে এবং ধর্ষণ-হত্যার বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাবে। এমনকি দেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অন্যদের সঙ্গে অপরাধীদের শাস্তির দাবিও তোলার পরিকল্পনা ছিল বলেও পুলিশের দাবি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ডিজি, পুলিশ হেফাজতে আনন্দ
মঙ্গলবার রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পুকুর, সংলগ্ন ঝোপঝাড় এবং যেখান থেকে নাবালিকাকে অপহরণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই স্থানও ঘুরে দেখেন তিনি। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে তদন্তকারী আধিকারিকদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর অভিযুক্তরা রেললাইন ধরে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে পোশাক বদলে ফেলে। পরে আনন্দ ও প্রভাসকে গ্রেফতার করা হলেও একসময় পুলিশ ক্যাম্প থেকে আনন্দ পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ। পরে তাকে ফের গ্রেফতার করা হয়। মঙ্গলবার তাকে বারুইপুর আদালতে তোলা হলে আদালত ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়।