
এই তো কয়েকটা দিন আগে ভারতের প্রশংসা করেছিল রাশিয়া। আমেরিকা, ইউরোপের বাধায় ডলারে ব্যবসা বন্ধ হয়েছে পুতিনের দেশের। এমন সময়ে ব্রিকস দেশগুলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য করেছে মস্কো। মুখে রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, এটা মোটেও ডলারকে এড়ানো নয়। বরং আন্তর্জাতিক লেনদেনকে যতটা সম্ভব বৈচিত্র্যময় করাই লক্ষ্য। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। চিন আর রাশিয়া নিজেদের মধ্যে এখন দেদার ইউয়ান আর রুবেলে বাণিজ্য করছে। ডলার দরকারই পড়ছে না। ভারতও রাশিয়ার তেল কেনে টাকায়। স্বাভাবিকভাবেই ভারতে ব্রিকস সম্মেলনের আগে আরও কৌতূহল তৈরি হয়েছে, মার্কিন ডলার আরও কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে? কারণ ব্রিকসে রয়েছে ভারত, রাশিয়া, চিন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নতুন সদস্য দেশগুলি। বিশ্বের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। বুঝতেই পারছেন, ব্রিকসের সিদ্ধান্ত কতটা ফেলবে ডলার-বাণিজ্য!
রাশিয়া-চিনের বাণিজ্য
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারেও ডলারের পরিবর্তে চিনা ইউয়ানের গুরুত্ব বেড়েছে। চিন ও রাশিয়া যৌথভাবে ডলারের উপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মার্কিন নীতিতে ক্ষুব্ধ বেশ কয়েকটি দেশও ডলারের বিকল্প ব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে। আমেরিকার SWIFT ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্কের বিকল্প হিসেবে চিন তৈরি করেছে নিজস্ব ব্যবস্থা Cross-Border Interbank Payment System বা CIPS। অন্যদিকে, রাশিয়া তৈরি করেছে SPFS। রাশিয়া থেকে চিনে যাওয়া অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লার দাম এখন সরাসরি ইউয়ান ও রুবলে মেটানো হচ্ছে। অর্থাৎ ডলারের কোনও ভূমিকা নেই। একটা পরিসংখ্যান দিলে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হবে, বর্তমানে চিন ও রাশিয়ার মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি বাণিজ্য চিনা ইউয়ান এবং রুশ রুবলে হয়। এর মধ্যে ইউয়ানের অংশ প্রায় ৭০ শতাংশ। নিষেধাজ্ঞার কারণে এই পরিবর্তন হলেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে মার্কিন ডলার।
চিনকে নিয়ে এত ভয় কেন আমেরিকার?
আমেরিকার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চিন। বিশ্বজুড়ে পণ্য বিক্রির বড় অংশই চিনের নিয়ন্ত্রণে। চিন বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র এবং অন্যতম বৃহৎ রফতানিকারক দেশ। চিন যদি তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ান ব্যবহার করে, তাহলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তন আসতে পারে। শুধু তা-ই নয়, বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য নিজেদের ডিজিটাল মুদ্রাও চালু করতে চাইছে চিন। এর ফলে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রচলিত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে অনেকটাই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।
ভারতের অবস্থান
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চিন ও রাশিয়া দ্রুত ডলারের উপর নির্ভরতা কমানোর পথে এগোলেও ভারতের অবস্থান বাস্তববাদী এবং ভারসাম্যপূর্ণ। ভারত কোনও একটি মুদ্রার (ইউয়ান বা ডলার) একচ্ছত্র আধিপত্যের পরিবর্তে একটি মাল্টি-পোলার বা বহুমেরু আর্থিক ব্যবস্থার পক্ষে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতীয় টাকার ব্যবহার বাড়ানোর উপরও জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি। লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতের স্বার্থকে সুরক্ষিত রাখা।
ব্রিকস দেশগুলির নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য?
প্রযুক্তিগত এবং বাস্তব দিক থেকে ব্রিকস দেশগুলি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে নিজেদের মুদ্রা ব্যবহারের দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তবে এই পথে এখনও বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ভারসাম্য থাকলে, অর্থাৎ আমদানি ও রফতানির পরিমাণ সমান হলে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন করা তুলনামূলকভাবে সহজ। অন্যতম উদাহরণ রাশিয়া ও ভারতের বাণিজ্য। ভারত রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কেনে। কিন্তু তার বিনিময়ে রাশিয়া ভারত থেকে একই পরিমাণ পণ্য কেনে না। ফলে ভারত যখন রাশিয়াকে ভারতীয় টাকায় দাম মেটায়, তখন রাশিয়ার হাতে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় টাকা জমা হয়। রাশিয়ার তরফে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠেছে, এই বিপুল পরিমাণ টাকা তারা কোথায় ব্যবহার করবে? কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতীয় টাকা এখনও ডলার বা ইউয়ানের মতো সর্বজনগ্রাহ্য মুদ্রার বিকল্প হয়ে ওঠেনি।