
একসময় চিনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়েই চিন্তা করতেন সকলে। কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানেই পুরো উল্টো সমস্যায় ভুগছে চিন। জন্মহার নিয়ন্ত্রণে তুমুল কড়াকড়ি করেছিল চিন সরকার। তার ফলে ২০-৩০ বছরের ব্যবধানে ব্যাপক হারে পড়ে গিয়েছে চিনের জন্মহার। ফলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হ্রাস, বৃদ্ধদের সংখ্যা বৃদ্ধি, সামাজিক কাঠামো বদল-সহ একাধিক সমস্যার মুখে বেজিং সরকার।
২০২৫ সালে মাত্র ৭৯.২ লক্ষ শিশু জন্মেছে চিনে। এক দিকে জন্মের সংখ্যা কমেছে, অন্য দিকে মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেশি। ফলে চিনের জনসংখ্যা কমার গতি আরও বেড়েছে। নতুন পরিসংখ্যান সামনে আসতেই চিনের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চিনের National Health Commission বা NHC প্রকাশিত ২০২৫ সালের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশে জন্মহার নেমে হয়েছে প্রতি ১,০০০ জনে মাত্র ৫.৬৩। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৩ লক্ষ ১০ হাজার মানুষের। অর্থাৎ, জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই বেশি।
এক বছরে জন্ম কমল প্রায় ১৬ লক্ষ
চিনে জন্মহার কমার প্রবণতা নতুন নয়। তবে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। কারণ, ২০২৪ সালে জন্মের সংখ্যা সামান্য বেড়েছিল। কিন্তু সেই বৃদ্ধির ধারা এক বছরও ধরে রাখা গেল না।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে চিনে প্রায় ১ কোটি ৬ লক্ষ ২০ হাজার শিশু জন্মেছিল। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা কমে হয় ৯৫ লক্ষ ৬০ হাজার। ২০২৩ সালে আরও কমে ৯০ লক্ষ ২০ হাজারে দাঁড়ায়।
এর পর ২০২৪ সালে কিছুটা স্বস্তি মিলেছিল। সে বছর জন্ম হয়েছিল প্রায় ৯৫ লক্ষ ৪০ হাজার শিশুর। কিন্তু ২০২৫ সালে আচমকাই সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭৯ লক্ষ ২০ হাজারে।
অর্থাৎ, এক বছরের মধ্যেই প্রায় ১৬ লক্ষের বেশি জন্ম কমেছে।
মৃত্যুর সংখ্যা জন্মের চেয়ে অনেক বেশি
চিনের জনসংখ্যার সমস্যার আরও একটি বড় কারণ হল মৃত্যুর সংখ্যা। ২০২৫ সালে দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ১৩ লক্ষ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জন্ম হয়েছে ৭৯ লক্ষ ২০ হাজার শিশুর।
এর ফলে জন্ম ও মৃত্যুর হিসাবের ফারাক আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালে চিনের প্রাকৃতিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নেমে হয়েছে মাইনাস ২.৪১ প্রতি হাজারে। অর্থাৎ, নতুন মানুষ যত জন জন্মাচ্ছেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন।
২০২৪ সালেও চিনের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ঋণাত্মক। তখন তা ছিল মাইনাস ০.৯৯ প্রতি হাজার। এক বছরের মধ্যে সেই হার আরও অনেকটা নেমে যাওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে।
কেন সন্তান নিতে চাইছেন না চিনের মানুষ?
চিন সরকার গত কয়েক বছর ধরে জন্মহার বাড়ানোর জন্য একাধিক পদক্ষেপ করেছে। কিন্তু তাতেও এখনও বড় সাফল্য মেলেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান পালন, পড়াশোনা, বাড়ি এবং চিকিৎসার খরচের মতো বিষয়গুলি অনেক পরিবারের উপরে আর্থিক চাপ তৈরি করছে। পাশাপাশি কর্মজীবনের চাপ এবং শহুরে জীবনের খরচও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
ফলে সরকার নানা ভাবে পরিবারগুলিকে সন্তান নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে।
শিশু প্রতি বছরে ৩৬০০ ইউয়ান ভর্তুকি
জন্মহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৫ সালে চিন সরকার নতুন Childcare Subsidy চালু করেছে। তিন বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য প্রতি বছর ৩,৬০০ ইউয়ান করে ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, শিশুদের দেখাশোনার জন্য পরিষেবা বাড়ানো এবং পরিবারগুলিকে সাহায্য করতে শিক্ষা, চাকরি, কর এবং আবাসন সংক্রান্ত নীতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
চিনের National Health Commission-এর বক্তব্য, এই সমস্ত উদ্যোগের লক্ষ্য হল এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে পরিবারগুলি সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি উৎসাহ পাবে এবং সন্তান বড় করার খরচ কিছুটা কমবে।
বিশ্বের অন্যতম বড় দেশেও জনসংখ্যা কমছে
চিনের মোট জনসংখ্যা ২০২৫ সালের শেষে প্রায় ১৪০ কোটি ছিল। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ হওয়া সত্ত্বেও জন্মহার ক্রমাগত কমতে থাকায় ভবিষ্যতে চিন বড়সড় মুশকিলে পড়তে পারে।