
ইরান, আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধে যে বিরতি হল, তাতে আখেরে কার লাভ হল? যদি বলি, চিন ও ইরানের। হ্যাঁ, পাকিস্তান যতই লম্ফঝম্ফ করুক, কূটনৈতিক জয় নিয়ে, দিনের শেষে দেখা যাচ্ছে, আসল খেলাটা খেলে দিল চিন। এবং সঙ্গে অবশ্যই ইরান। এই যুদ্ধবিরতিতে বিশ্ব অর্থনীতি কার্যত নিজেদের হাতে নিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে কয়েক যোজন এগিয়ে গেল চিন ও ইরান। আমেরিকার একচেটিয়া দাদাগিরি শেষের পথে?
ডলারের আধিপত্য খতমের পথে?
আসলে এখানে ডলারের খেলা। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য শুধুই ডলারের। আর এখানেই হেরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের আধিপত্য চলছে। সেই আধিপত্যকে খতম করতে একেবারে উঠে পড়ে লেগেছে চিন ও ইরান। কারণ, এই দুই দেশকেও ডলারেই লেনদেন করতে হয়।
মূলত, বিশ্বে তেলের বাজারে ৮০ শতাংশ লেনদেন হয় ডলারে। ২০২৩ সালে জেপি মর্গান চেজ-এর রিপোর্ট তাই বলছে। মধ্যপ্রাচ্যের হয়ে বিশ্ব তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক পঞ্চমাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ইরান একাই। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। এহেন সময়ে ইরান ও চিন সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে, কীভাবে চিনা মুদ্রা ইউহানকে ডলারের বিকল্প করা যায়। অর্থাত্ বিশ্বের ডলারের বিকল্প হিসেবে ইউয়ানকে ছড়িয়ে দেওয়া। তাহলে ভেঙে পড়বে আমেরিকার অর্থনীতি।
তেহরান ও বেজিংয়ের মোক্ষম চাল
যার নির্যাস, হরমুজের টোল বুথে ইউয়ানে লেনদেন করছে ইরান। মোদ্দা বিষয়, চিন ও ইরান মিলে একটি অলিখিত অর্থনৈতিক কো-অপারেশন নিজেদের মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে। এখানে দুটো লাভ দুই দেশের। বস্তুত, তেহরান ও বেজিং, দুই পক্ষের কাছেই ইউয়ানের লেনদেন 'Win Win' পরিস্থিতি। প্রথমত, ইরামের শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত আমেরিকার অর্থনীতি হামলা করা যাবে। কারণ, ডলারের লেনদেন বন্ধ হলে বড় ধাক্কা খাবে মার্কিন অর্থনীতি। দ্বিতীয়ত, চিনের সুবিধা হল, এই সুযোগে ইউয়ান বিশ্ব অর্থনীতিতে লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠবে। শক্তিশালী হবে চিনের অর্থনীতি। এছাড়াও ডলারের যে ভাবে দাম বাড়ছে, ইউয়ানে কেনাবেচা হলে, তা খানিক সস্তাও হবে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা করতে হবে না ইরানকে।
গেমচেঞ্জার প্ল্যান চিন ও ইরানের
গত শনিবার জিম্বাবোয়েতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস সোশ্যাল মিডিয়ায় জানায়, বিশ্বের তেলের বাজারে 'পেট্রোইউয়ান' যোগ করার সময় এসে গিয়েছে। অর্থাত্ পেট্রোলিয়াম কেনাবেচা চলবে ইউয়ানে। ইরানের মোট তেল রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি এখন একাই কেনে চিন। এই বিশাল পরিমাণ লেনদেন মার্কিন ডলারের বদলে চিনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয় বলে ধারণা করা হয়, যার ফলে চিন বিশেষ ছাড়ে তেল কেনার সুযোগ পায়। এর বিনিময়ে ইরান চিন থেকে বিপুল পরিমাণে ভারী যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক এবং শিল্পাঞ্চলীয় যন্ত্রাংশ আমদানি করে।
তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলির মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলে এই দুই দেশের মধ্যে তেলের বাণিজ্যে খুব একটা প্রভাব পড়েনি এবং সরবরাহের পরিমাণ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্তরের মতোই স্বাভাবিক রয়েছে। ‘কেপলার’ এবং ‘ট্যাঙ্কার ট্র্যাকারস’-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরান ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৩৭ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রফতানি করেছে, যার সিংহভাগই গিয়েছে চিনে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানো চিনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য। ২০২৪ সালে এক ভাষণে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আশা প্রকাশ করেছিলেন, ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাধারণ মুদ্রা হয়ে উঠবে এবং ‘গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি’র মর্যাদা লাভ করবে।