
সৌরশক্তির মতোই একটি অফুরান্ত প্রাকৃতিক শক্তির ভাণ্ডার তৈরি করার চেষ্টা করছে জার্মানি। তবে তার জন্য দরকার কৃত্রিম সূর্যও। নইলে সৌরশক্তির মতো পাওয়ার আসবেই বা কীভাবে? সেই কারণেই একটি কৃত্রিম সূর্য বানাতে মরিয়া রয়েছেন জার্মান বিজ্ঞানীরা। বেসরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে জার্মানিরা নিউক্লিয়ার ফিউশন নিয়ে কাজ করছে। ফিউশন প্রক্রিয়ায় হালকা পরমাণুগুলোকে একত্রিত করা হয়, যা থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়। জার্মান সংস্থা প্রক্সিমা ফিউশন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর প্লাজমা ফিজিক্সের সাথে স্টেলারেটর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। সংস্থাটি প্রথমে আলফা নামের একটি যন্ত্র তৈরি করবে। এরপর স্টেলারিস নামের একটি ফিউশন বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
ফিউশন হলো সেই একই প্রক্রিয়া যা সূর্যে শক্তি তৈরি করে। সূর্যের অভ্যন্তরভাগ অত্যন্ত উত্তপ্ত ও চাপযুক্ত, যা হাইড্রোজেন পরমাণুগুলোকে একত্রিত হয়ে শক্তি নির্গত করতে বাধ্য করে। বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে এই প্রক্রিয়াটির অনুকরণ করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এটি কোনও সহজ কাজ নয়।
ফিউশন প্রক্রিয়ায় প্লাজমাকে লক্ষ লক্ষ ডিগ্রি পর্যন্ত উত্তপ্ত করতে হয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল যন্ত্রের ভেতরে এই তাপ নিয়ন্ত্রণ করা। এই উদ্দেশ্যে জার্মানি স্টেলারেটর প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। এই চৌম্বক ক্ষেত্র উত্তপ্ত প্লাজমাকে যন্ত্রের দেয়াল থেকে দূরে রাখে।
স্টেলারেটরে ফিউশন কীভাবে ঘটবে?
স্টেলারেটর হল এক বিশেষ ধরনের ফিউশন যন্ত্র। এতে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় কয়েল থাকে। এই কয়েলগুলো একত্রে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে, যা উত্তপ্ত প্লাজমাকে যন্ত্রটির কেন্দ্রে আবদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। ফিউশন ঘটার জন্য প্লাজমার তাপমাত্রা কয়েকশ মিলিয়ন ডিগ্রিতে পৌঁছাতে হয়।
জার্মানিতে ওয়েন্ডেলস্টাইন ৭-এক্স নামের একটি যন্ত্র এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এই যন্ত্রের প্লাজমার তাপমাত্রা প্রায় ৩ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। একটি পরীক্ষায় প্লাজমাটিকে ৪৩ সেকেন্ড ধরে বজায় রাখা হয়েছিল।
আলফার পরে স্টেলারিস তৈরি করা হবে
প্রক্সিমা ফিউশনের প্রথম প্রধান লক্ষ্য হলো আলফা। এটি মিউনিখের কাছে গার্চিং-এ নির্মিত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটও এই কোম্পানির সাথে কাজ করছে। আলফার লক্ষ্য হলো, স্টেলারেটর ব্যবহার করে ফিউশন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত শক্তির চেয়ে বেশি শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব কি না, তা পরীক্ষা করা। এই প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরো অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় তা ২ হাজার ৬১৯ কোটি টাকারও বেশি।
কোম্পানিটি এখন স্টেলারিস নামক একটি ফিউশন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এই উদ্দেশ্যে বাভারিয়ার গুন্ড্রেমিঙ্গেনে অবস্থিত প্রাক্তন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থানটি বেছে নেওয়া হয়েছে। কোম্পানিটির লক্ষ্য হল ফিউশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা গ্রিডে সরবরাহ করা। তবে, এই প্রকল্পটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
জার্মান সরকারও এই গবেষণায় ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করছে। সরকারের মতে, তারা তাদের বর্তমান মেয়াদে ফিউশন-সম্পর্কিত গবেষণা এবং অন্যান্য প্রকল্পে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ইউরো ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে। তবে, ফিউশন থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এখনও অত্যন্ত কঠিন। বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গিয়েছে। প্লাজমার ওপর ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, যন্ত্রকে অতিরিক্ত তাপ থেকে রক্ষা করা এবং ফিউশন থেকে উৎপন্ন শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং বলেই জানা গিয়েছে।
ভারতে এই কৃত্রিম সূর্য তৈরি করা হচ্ছে
উল্লেখ্য, ভারতও কিন্তু আগেই এমন কাজে হাত দিয়েছে। এদেশেও গুজরাতে গবেষণাগারের ভিতরেই সূর্যের মতো শক্তি তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে চলছে পরীক্ষা। জরাতের ইনস্টিটিউট ফর প্লাজ়মা রিসার্চ (IPR)। সেখানে ভারতের পরীক্ষামূলক ফিউশন যন্ত্র SST-1 টোকাম্যাকে নতুন ৮২.৬ গিগাহার্টজ় এবং ৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি গাইরোট্রন বসানো হয়েছে। যন্ত্রটি চালুও করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এর সাহায্যে অত্যন্ত গরম প্লাজ়মাকে আরও বেশি সময় ধরে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে গবেষণা করা সম্ভব হবে।