
গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যাশ্চর্য এক জিনিস। জানা যাচ্ছে, হান্টাভাইরাস সংক্রমণের পর একজন পুরুষের শুক্রাণুতে ৬ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে! ফলে সেই ব্যক্তি হান্টাভাইরাস সংক্রমণের পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেও যৌন মিলনের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। যাঁরা এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন, তাঁদের জন্য এই তথ্যটি নিঃসন্দেহে চাঞ্চল্যকর।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে সুইৎজারল্যান্ডের স্পিজ ল্যাবরেটরি, যা পরমাণু, জৈবিক এবং রাসায়নিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে এমন একটি সরকারি সংস্থা। বিজ্ঞানীরা ৫৫ বছর বয়সী এক সইস ব্যক্তির উপর পরীক্ষা চালান, যিনি ৬ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকায় হান্টাভাইরাসের অ্যান্ডিস স্ট্রেইনে সংক্রমিত হয়েছিলেন।
তাঁর রক্ত, মূত্র বা শ্বাসতন্ত্রে ভাইরাসের কোনও চিহ্ন অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু ৭১ মাস (প্রায় ৬ বছর) পরেও তাঁর শুক্রাণুতে ভাইরাসটি উপস্থিত ছিল। বিজ্ঞানীরা বলেন, 'পুরুষদের অণ্ডকোষ ভাইরাসটির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেখানে সহজে পৌঁছতে পারে না। কারণ প্রজননের জন্য শুক্রাণু কোষগুলি সুরক্ষিত থাকে। এ কারণেই ভাইরাসটি সেখানে লুকিয়ে থেকে বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে।'
ইবোলা এবং জিকা ভাইরাসের মতো সমস্যা
এই নতুন আবিষ্কারটি ইবোলা এবং জিকা ভাইরাসের আবিষ্কারের অনুরূপ। এই ভাইরাসগুলি যে অণ্ডকোষে লুকিয়ে থাকে, তা আগে থেকেই জানা ছিল। ২০২১ সালে গিনিতে একটি ছোট ইবোলা প্রাদুর্ভাব এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সংসর্গের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল, যিনি ২০১৪-১৬ সালের বড় মহামারি থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তির শুক্রাণুতে ভাইরাসটি বছরের পর বছর ধরে থেকে গিয়েছিল।
হান্ডাভাইরাসের যৌন সংক্রমণের কোনও নিশ্চিত ঘটনা এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অ্যান্ডিস ভাইরাসের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য।
ক্রুজ জাহাজের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী?
সম্প্রতি ব্রিটেনে এমভি হন্ডিয়াস ক্রুজ জাহাজে ৮টি নিশ্চিত হান্টাভাইরাস সংক্রমণ এবং ২০টি উপসর্গহীন সংক্রমণের খবর পাওয়া গিয়েছে। এই গবেষণাটি এই সংক্রমণগুলির উপর নজরদারির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পুরুষ রোগীদের ৪২ দিনের কোয়ারেন্টাইনের পাশাপাশি দীর্ঘ সময়ের জন্য নিরাপদ যৌন মিলন করার পরামর্শ দেওয়া উচিত। অর্থাৎ কন্ডোমের ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে তাঁদের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইবোলা থেকে সেরে ওঠা পুরুষদের জন্য কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলে। প্রতি ৩ মাস অন্তর তাঁদের শুক্রাণু পরীক্ষা করা হয়। পরপর ২টি নেগেটিভ ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের অবশ্যই সব ধরনের যৌন মিলন থেকে বিরত থাকতে হবে অথবা প্রতিবার সঠিক ভাবে কন্ডোম ব্যবহার করতে হবে।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অন্তত ২৭টি সংক্রামক রোগ অণ্ডকোষে বাসা বাঁধতে পারে। তাই হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদেরও একই ধরনের নির্দেশিকা মেনে চলা উচিত। বিশেষ করে যতক্ষণ না তাঁদের ডাক্তার সম্পূর্ণ সুস্থতার ছাড়পত্র দেন।
ব্রিটেনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা (UKHSA) জানিয়েছে, তারা সমস্ত নতুন গবেষণা পর্যবেক্ষণ করছে। যাঁরা সংক্রমিত বা সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁদের যৌন সতর্কতা সহ আরও সংক্রমণ প্রতিরোধের পরামর্শ দেওয়া হবে।
এমনটা কেন হয়?
পুরুষের অণ্ডকোষে শুক্রাণু উৎপন্ন হয়। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই শুক্রাণু কোষগুলিকে আক্রমণ করে না। নইলে প্রজনন থেমে যেত। এই সুরক্ষা ভাইরাসের জন্যও উপকারী। ভাইরাসটি এখানে লুকিয়ে থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেয়। এচি বছরের পর বছর সক্রিয় থাকতে পারে। যখন কোনও ব্যক্তি যৌন সম্পর্ক তৈরি করেন, তখন ভাইরাসটি তার সঙ্গীর দেহে সংক্রমিত হতে পারে।
রোগী ও তাঁর পরিবারের কী করা উচিত?
> সংক্রমণের পর দীর্ঘ সময় ধরে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা উচিত।
> নিরাপদ যৌন মিলন করুন অথবা কন্ডোম ব্যবহার করুন।
> হাত ধুয়ে নিন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন এবং সতর্কতা অবলম্বন করুন।
> পরিবারে সদস্যদেরও অবগত করুন।
> নিয়মিত শুক্রাণু পরীক্ষা করান।
এই আবিষ্কারটি চিকিৎসা জগতের জন্য় একটি নতুন শিক্ষা। হান্টাভাইরাস এখন শুধু ইঁদুর বা বায়ুবাহিত রোগ নয়। এটি যৌন সংসর্গের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। তাই ডাক্তার স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষের এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা এই বিষয়টি নিশ্চিত করবে এবং আরও ভাল প্রতিরোধের উপায় বের করবে। আপাতত সতর্কতাই সর্বোত্তম সুরক্ষা।