
হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে দুবাই উপকূলে জাহাজের ভিড়! ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার মাঝে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন সঙ্কটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার আচমকাই দুবাইয়ের কাছাকাছি সমুদ্রসীমায় শতাধিক জাহাজকে এক জায়গায় অপেক্ষা করতে দেখা যায়। অভিযোগ, ইরান হরমুজ প্রণালীর উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও কড়া করতে চাইছে। সেই কারণেই বহু বাণিজ্যিক জাহাজ ঝুঁকি এড়াতে পথ বদলে দুবাই উপকূলের দিকে সরে গিয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণের রুট হরমুজ প্রণালী এখন কার্যত আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। দুই দেশের মধ্যে এখনও গুলির লড়াই চলছে। এর মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের রাস্তা খুলে দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম CBS-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার দু’টি যুদ্ধজাহাজ ইতিমধ্যেই পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছে।
অন্য দিকে, জাহাজের ক্রু সদস্যদের দাবি, রেডিয়ো সম্প্রচারের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে। জানানো হয়েছে, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC নতুন ‘সুরক্ষিত সামুদ্রিক সীমান্ত অঞ্চল’ ঘোষণা করেছে। অভিযোগ, ইরান এখন সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ফুজাইরা বন্দরে হামলাও চালাচ্ছে। এর থেকেই স্পষ্ট, ওই অঞ্চলকে তারা নিজেদের সম্প্রসারিত নিয়ন্ত্রণ বলয়ের অংশ হিসেবে দেখতে চাইছে।
এই হামলার জেরেই মঙ্গলবার সকাল থেকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে যায়। নতুন নিয়ন্ত্রণ বলয়ের মানচিত্র অনুযায়ী, দুবাই সেই সীমার ঠিক বাইরে পড়ছে। দক্ষিণ দিকে এই নিয়ন্ত্রণ বলয় উম আল-কুয়েন পর্যন্ত বিস্তৃত।
আন্তর্জাতিক শিপিং বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। অয়েল ব্রোকারেজ লিমিটেডের গ্লোবাল হেড অনুপ সিং ব্লুমবার্গকে বলেন, “আমেরিকা হরমুজ প্রণালীতে শক্তির ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। ইরান তার পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এতে উত্তেজনা আরও বাড়বে। দ্রুত দু’মুখী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে বলে মনে হচ্ছে না।”
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম এশিয়ার বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছয়। গত নয় সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতের আবহে এই জলপথই এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩৫টি জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
এদিকে, সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ফুজাইরা পেট্রোলিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ জোনে হামলার ঘটনায় তিন ভারতীয় নাগরিক আহত হয়েছেন। ভারত এই হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) বলেন, 'সাধারণ মানুষ ও পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।' তিনি আরও জানান, ভারত সংযুক্ত আরব আমিরশাহির পাশে রয়েছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষেই অবস্থান করছে।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র Randhir Jaiswal সমাজমাধ্যমে লেখেন, “ফুজাইরায় হামলা এবং ভারতীয় নাগরিকদের আহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অবিলম্বে এই ধরনের শত্রুতামূলক কার্যকলাপ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে এবং ভারত আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষেই রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে যদি হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা চলতে থাকে, তা হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারত-সহ বহু দেশের অর্থনীতিতে। ফলে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির দিকে এখন নজর গোটা বিশ্বের।