
মার্কিন-ইরান শান্তি আলোচনার সময় যে বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে তা হলো ইরানের ফ্রিজ হওয়া সম্পদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে। এই প্রসঙ্গে ভারতের নামও রয়েছে, যেখানে ইরানের প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫৬,০০০ কোটি রুপি আটকে আছে। এটি কোনও সামান্য পরিমাণ অর্থ নয়, একারণেই তেহরান তা ফেরত আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে।
এই পুরো কাহিনিটি ১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। তখন থেকে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। মার্কিন দূতাবাসে অপরহণ সঙ্কট থেকে শুরু করে পারমাণু কর্মসূচি পর্যন্ত, ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো আরও কঠোর হয়েছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের পারমাণু এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর থেকে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো, ইরান তার নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যবহার করতে পারছে না। যখন কোনও দেশ অন্য কোনও দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন তার ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন অবরুদ্ধ হয়ে যায়। এ কারণেই ইরানের তেল বিক্রি করে অর্জিত অর্থ অনেক দেশের ব্যাঙ্কে জমা থাকলেও তা ফ্রিজ হয়ে আছে। অর্থাৎ, ইরান তা ব্যবহার করতে পারছে না।
ইরানের অর্থ ভারতে কেন আটকে আছে?
ভারতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। ভারত পূর্বে ইরান থেকে বিপুল পরিমাণে অপরিশোধিত তেল ক্রয় করেছিল। সেই তেলের মূল্য ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলোতে জমা রাখা হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই অর্থ সরাসরি ইরানে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে, এই অর্থ ভারতেই ‘আটকে’ থেকে যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রেস টিভির মতে, ইরানের অর্থ শুধু ভারতেই নয়, আরও অনেক দেশে আটকে আছে। রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, চিনে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার, ইরাকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার, জাপানে ১.৫ বিলিয়ন ডলার এবং কাতারে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। এছাড়াও কিছু ইউরোপিয় দেশ এবং খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের ২ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। রিপোর্ট থেকে বলা হচ্ছে , বিশ্বজুড়ে ইরানের ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ ফ্রিজ করা হয়েছে।
ইরানের অর্থের ওপর কেন নিষেধাজ্ঞা?
এখন প্রশ্ন ওঠে, ‘ফ্রোজেন অ্যাসেটস’ বলতে ঠিক কী বোঝায়? সহজ কথায়, যখন কোনও দেশের সম্পদ—তা অর্থ, সম্পত্তি বা বিনিয়োগ যাই হোক না কেন—অন্য কোনও দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক অবরুদ্ধ করা হয়, তখন সেগুলোকে ফ্রিজড অ্যাসেট হিসেবে গণ্য করা হয়। সাধারণত নিষেধাজ্ঞা, আইনি বিরোধ বা আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে এটি করা হয়ে থাকে।
এই অর্থ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ইতিমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে এবং এই আটকে থাকা অর্থ পেলে তা আরও শক্তিশালী হতে পারে। এই অর্থ পুনরুদ্ধার দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে। এ কারণেই, সাম্প্রতিক আলোচনায় ইরান কমপক্ষে ৬০০ কোটি ডলার রিলিজ করার আবেদনকে 'আস্থা তৈরির পদক্ষেপ' হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আমেরিকা কেন ইরানের অর্থ ছাড়ছে না?
কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ নয়। অর্থ রিলিজ করা হলেও, তা কীভাবে ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কঠোর। তারা আশঙ্কা করে, এই অর্থ ইরানের সামরিক বা পারমাণু কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হতে পারে। এ কারণেই প্রতিবার আলোচনা থমকে যায়। তবে, ইরান জোর দিয়ে বলছে, এই অর্থ তাদের এবং এর ব্যবহার তারাই নির্ধারণ করবে। আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও ইরান হয়তো সঙ্গে সঙ্গে তার সম্পূর্ণ অর্থ পাবে না। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই অর্থের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই পুরোনো ঋণ পরিশোধ বা বিনিয়োগে আটকে আছে। তাই তেহরান কেবল আংশিক স্বস্তি পাবে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে আটকে থাকা ইরানের ৬৫২ বিলিয়ন রুপি শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির একটি বড় অংশ। যতক্ষণ না মার্কিন-ইরান সম্পর্কের উন্নতি হয় এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়, এই অর্থ ব্যাঙ্কে ফ্রিজ থাকবে। আগামী দিনে একটি বড় ডিল হলেই কেবল ইরান তার ফান্ড পেতে পারে বলে আশা করা যায়।