
আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধ চলছে ইরানের। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে আরও সংযত এবং যুক্তিসঙ্গত নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করছেন। যদিও তেহরান সেই দাবি সরাসরি খারিজ করেছে। এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠছে, ইরানে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে?
সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট সামনে এসেছে। সেই মোতাবেক, ইরানের শক্তিশালী সামরিক সংগঠন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) কার্যত দেশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যিনি তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত, তাঁকে কার্যত অকেজো করে দেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন হামলার জবাব দিতে গিয়ে IRGC এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এমনকি একটি মিলিটারি কাউন্সিল গঠন করে শীর্ষ IRGC কর্মকর্তারাই প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সুপ্রিম লিডারকে ঘিরে রহস্য
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে সুপ্রিম লিডারের অনুপস্থিতিতে। মার্কিন-ইজরায়েলি হামলায় আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনেইকে সুপ্রিম লিডার ঘোষণা করা হয়। তবে এরপর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি বা তাঁর কোনও বক্তব্য সরাসরি শোনা যায়নি।
শুধুমাত্র টেলিভিশনে বার্তা পড়ে শোনানো হচ্ছে, যা ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়েছে, মোজতবা কি আদৌ সুস্থ আছেন? বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি, তিনি গুরুতর অসুস্থ বা কোমায় থাকতে পারেন। যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনও তথ্য সামনে আসেনি।
IRGC-র পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, IRGC সুপ্রিম লিডারের চারপাশে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। এমনকি সরকারি রিপোর্টও তাঁর কাছে পৌঁছাতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রেসিডেন্টের একাধিকবার সাক্ষাতের অনুরোধও নাকি উপেক্ষা করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, প্রশাসনিক নিয়োগেও হস্তক্ষেপ করছে IRGC। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের পছন্দের প্রার্থীকে গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছে IRGC-র চাপে। সংস্থার প্রধান আহমদ বাহিদি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সব পদে নিয়ন্ত্রণ থাকবে IRGC-র হাতেই।
প্রেসিডেন্ট বনাম IRGC দ্বন্দ্ব
গত কয়েকদিন ধরেই প্রেসিডেন্ট ও IRGC-র মধ্যে মতভেদের খবর সামনে আসছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলিতে হামলা চালানো নিয়ে পেজেশকিয়ান আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর আশঙ্কা, এতে ইরানের অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হবে। ইতিমধ্যেই দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মুখে।
ক্ষমতার কেন্দ্র বদলাচ্ছে ইরানে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তৈরি হওয়া IRGC দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার কেন্দ্র হতে চাইছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা তেল, ব্যাঙ্কিং, পরিবহণ ও রিয়েল এস্টেট-সহ একাধিক ক্ষেত্রে নিজেদের শক্তিশালী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।
বর্তমানে সুপ্রিম লিডারের অনিশ্চিত অবস্থান এবং রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে IRGC তাদের দখল আরও মজবুত করেছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণও এখন তাদের হাতেই, যা বিশ্ব তেলের সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ইরানে এখন এক অনিশ্চিত ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা ক্রমশ কমে গিয়ে সামরিক শক্তির প্রভাবই প্রধান হয়ে উঠছে।