
নেপালে হড়পা বানে বিপর্যয়ে অনেকেই চিনকে দোষারোপ করছে। অনেকের দাবি, চিন আগেই জানত। কিন্তু নেপালকে সতর্ক করেনি। চিনের 'ভূতাত্ত্বিক দুর্যোগ বাঁধ' ভেঙেই এই বিপর্যয় বলে দাবি করছে একাংশ। নেপালের সংবাদমাধ্যম, নেপাল করেসপন্ডেন্স নামে একটি প্ল্যাটফর্ম, যারা নিজেদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মঞ্চ বলে দাবি করে, তারা X-এ একটি পোস্ট করে। সেই পোস্টে দাবি করা হয়, হড়পা বানটি আসলে একটি 'পরিকল্পিত পরিবেশগত বিপর্যয়', যার সঙ্গে তিব্বত সীমান্তের কাছে চিনের নির্মাণকাজের যোগ রয়েছে। তবে এই দাবির স্বপক্ষে কোনও শক্তিশালী প্রমাণ এখনও মেলেনি।
চিনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ
X হ্যান্ডেলে তারা আরও লিখছে, 'আজকের বন্যার সূত্রপাত হয়েছে চিনের দখল তিব্বতের গিরং শহরের কাছে। পাহাড় কেটে ওই শহরটি তৈরি করা হয়েছে। এমনকী শহরটি ত্রিশূলী নদীর প্রাকৃতিক গতিপথের উপরেই গড়ে তোলা হয়েছে। হিমবাহে আচ্ছাদিত পর্বতশৃঙ্গগুলির সংবেদনশীল ইকোসিস্টেমের ক্ষতির ফলে এখন প্রতি বছরই তুষারধস হচ্ছে, যার জেরে নেপালে হড়পা বান দেখা দিচ্ছে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।' হিমালয়ের ইকোসিস্টেমকে চিন ধ্বংস করে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
চিন কি নেপালকে আগে সতর্ক করতে পারত?
অনেকে এও দাবি করছে, চিন নাকি নেপালকে এত বড় বিপর্যয়ের আগে সতর্ক করতে পারত। কিন্তু তা করেনি। অনেকে দাবি করছে, রাসুওয়াগাধি-গিরং সীমান্ত ক্রসিং এবং গিরং বন্দরের পরিকাঠামো যখন বন্যার ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হলে ভাটির দিকে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হত। নেপালের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম উকেরা-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩০ মিনিট নাগাদ তিব্বতের কেরুং কাউন্টিতে হড়পা বান আছড়ে পড়ে, যা নেপালের সময় অনুযায়ী সকাল ৮টা ১৫ মিনিট। এর প্রায় ৪৫ মিনিট পর সেই হড়পা বান নেপালের ভোটকোশি নদীর উপর দিয়ে ধেয়ে আসে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, চিনের কাছ থেকে নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকেই নেপাল প্রথম এই বিপর্যয়ের খবর পায়। ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA)-র মুখপাত্র শান্তি মহতের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৯টা নাগাদ রাসুওয়া জেলার চিফ ডিস্ট্রিক্ট অফিসার তাঁকে ফোন করে জানান, স্থানীয় বাসিন্দারা কেরুং থেকে নেপালের দিকে ধেয়ে আসা বন্যার জল দেখতে পেয়েছেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নেপালি সাংবাদিক পরশুরাম কাফলে। X-এ তিনি লেখেন, 'নেপাল তার প্রতিবেশীদের বৈধ নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের উত্তরের প্রতিবেশী আমাদের প্রতি যথেষ্ট অবহেলা করেছে। এত বড় একটি বিপর্যয়ের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা না দেওয়ায় বিপুল প্রাণহানি হয়েছে।'
তিনি আরও লেখেন, 'আমরা ক্রমাগত তাদের ভূখণ্ড থেকে উদ্ভূত সংকটের মুখোমুখি হয়েছি, অথচ তাদের প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় সমস্ত উদ্বেগের বিষয়েই আমরা সাড়া দিয়ে চলেছি। একতরফা ভালোবাসার মূল্য শুধু নেপালকেই কেন দিতে হবে?'
চিন এই সব অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী বলছে?
তিব্বতকে বরাবরই চিন নিজেদের দেশের ভূখণ্ড হিসেবেই দাবি করে। নেপালের বন্যা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগকে মিথ্যে ও ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে চিন। চিনের তরফে সাফ জানানো হয়েছে, 'একটি বিরাট হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ায় ভূমিকম্পের মতো পরিস্থিতি হয়, যার ফলেই নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান হয়েছে। এত মানুষের প্রাণ গেল।'
নেপালে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং মাওমিংয়ের কথায়, 'চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই বিপর্যয়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হল নিখোঁজদের খুঁজে বের করে উদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা, বিপদগ্রস্ত মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং যতটা সম্ভব প্রাণহানি কমানো।'