
নাসার আর্টেমিস ২ অভিযানের ৪ জন নভোচর নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এলেন। তাঁদের ক্যাপসুল 'ইন্টিগ্রিটি' দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেছে। এই অভিযানটি ১০ দিন স্থায়ী হয়েছিল। গত ৫০ বছরে এই প্রথম মানুষ চাঁদের এত কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। মোট ১১ লক্ষ ১৬ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছেন তাঁরা। এই অভিযানটি নাসার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যার মধ্যে ভবিষ্যতে মানুষ চাঁদে অবতরণ এবং তারপর মঙ্গল গ্রহে অভিযান করবে।
আর্টেমিস II অভিযান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আর্টেমিস II ছিল নাসার প্রথম মানববাহী পরীক্ষামূলক মাহাকাশযান। যাতে ৪ জন নভোচর ছিলেন। তাঁরা ১ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে একচি SLS রকেটে করে যাত্রা শুরু করেন। এই অভিযানের সময়ে তাঁরা ২টি কক্ষপথে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করেন। তারপর চাঁদের খুব কাছে চলে আসেন। চাঁদের দূরবর্তী অংশের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময়ে তাঁরা পৃথিবী থেকে তাঁদের সর্বাধিক দূরত্বে পৌঁছন। তাঁদের সর্বাধিক দূরত্ব ছিল ৪০৬,৭৭১ কিলোমিটার। যা অ্যাপোলো ১৩ -এর পূর্ববর্তী রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যায়।
এই অভিযানটি আর্টেমিস II কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করেছে। আর্টেমিসের লক্ষ্য হল ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ অবতরণ করানো এবং সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুবিধা স্থাপন করা। এর ফলে চাঁদ মঙ্গল গ্রহে যাত্রার একটি সোপান হয়ে উঠবে। এর আগে অ্যাপোলো অভিযানগুলির পর ১৯৭২ সালে শেষ বার মানুষ চাঁদে অবতরণ করেছিল।
অর্ধশতাব্দী পর আর্টেমিস II মানুষকে চাঁদের কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এই প্রথমবারের মতো একজন মহিলা, একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহাকাশচারী এবং ঐএকজন অ-মার্কিন নাগরিক এই মহাকাশযানে ছিলেন।
জলে অবতরণের সময়ে কী ঘটেছিল?
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময়ে ওরিয়ন ক্যাপসুলটি অত্যন্ত উচ্চ গতিতে চলছি। পুনঃপ্রবেশের সময়ে এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৩৯ হাজার কিলোমিটার। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ধর্ষণের ফলে ক্যাপসুলটির বাইরের অংশের তাপমাত্রা ২৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, যা একটি লাল তপ্ত প্লাজমার স্তর তৈরি করে এবং ৬ মিনিটের জন্য রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অবতরণ প্রক্রিয়ার ১৩ মিনিট ছিল অত্যন্ত উৎকণ্ঠার।
২০২২ সালের মনুষ্যবিহীন আর্টেমিস I পরীক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়ে নাসার বিজ্ঞানীরা তাপের সঞ্চয় কমাতে এবং মহাকাশযানটিকে সুরক্ষিত রাখতে এৎ গতিপথে সামান্য পরিবর্তন করেন। ক্যাপসুলটি এই পরীক্ষায় সফল ভাবে উত্তীর্ণ হয়।
প্লাজমার স্তরটি সরে গেলে ২ সেট প্যারাসুট খুলে যায়, যা ক্যাপসুলটির গতি কমিয়ে ঘণ্টায় ২৪ কিলোমিটারে নিয়ে আসে। অবশেষে এটি প্রশান্ত মহাসাগরে আলতো ভাবে অবতরণ করে। নাসার একটি ওয়েবকাস্টে সরাসরি ছবি দেখানো হয়. যেখানে প্যারাসুটগুলি খুলতে এবং ক্যাপসুলটিকে জলের উপর ভাসতে দেখা যায়।
জলে অবতরণের পর নাসা ও মার্কিন নৌবাহিনীর দল ক্যাপসুলটি সুরক্ষিত করে। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে নভোচারীদের ক্যাপসুল থেকে বের করে হেলিকপ্টারে করে নিকটবর্তী একটি উদ্ধারকারী জাহাজে নিয়ে যআওয়া হয়। যেখানে তাঁদের প্রথম স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়। পুরো অভিযানটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছিল কারণ ক্যাপসুলটি জলের উপর ভাসছিল।
এই ৪ মহাকাশচারী কারা?
এই ঐতিহাসিক অভিযানের ৪ জন সদস্য ছিলেন কমান্ডার এবং মার্কিন মহাকাশচারী রিড ওয়াইজম্যান (৫০ বছর), আমেরিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহাকাশচারী ভিক্টর গ্লোভার (৪৯ বছর), মিশন স্পেশ্যালিস্ট এবং চন্দ্র অভিযানে যাওয়া প্রথম মহিলা মহাকাশচারী ক্রিস্টিনা কচ (৪৭ বছর) এবং মিশন স্পেশ্যালিস্ট ও প্রথম অ-মার্কিনী চন্দ্র অভিযানকারী জেরেমি হ্যানসন (৫০ বছর)।
তাঁরা সকলেই অভিজ্ঞ এবং এই অভিযান চলাকালীন তাঁরা চাঁদের দূরবর্তী অংশ পর্যবেক্ষণ করেন। পৃথিবীর সুন্দর ছবি তোলেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালান। এই অভিযানটি অসংখ্য বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সাফল্যও এনে দিয়েছে। যা ভবিষ্যৎ অভিযানগুলির জন্য উপযোগী হবে।
আর্টেমিস প্রোগ্রামের প্রধান লক্ষ্য
এটি আর্টেমিস সিরিজের দ্বিতীয় অভিযান। প্রথম মনুষ্যবিহীন আর্টেমিস I ২০২২ সালে চাঁদের গিয়েছিল। এবার আর্টেমিস III-এর প্রস্তুতি নিচ্ছে নাসা। যার মধ্যে রয়েছে চন্দ্র অবতরণের পরিকল্পনাও। এর দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হল একটি চন্দ্র ঘাঁটি তৈরি করা। যেখানে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। এই সবকিছুই হল মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতির অংশ। ঠান্ডা ।ুদ্ধের সময়ে অ্যাপোলো অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে ছাপিয়ে যাওয়া এবং আর্টেমিসের উদ্দেস্য চিনকে টপকানো।