
নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা সোমবার বেড়ে ৯০৩-এ দাঁড়িয়েছে এবং প্রায় ৪,২৫০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। আধিকারিকরা জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী দলগুলো ক্রমাগত মৃতদেহ উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্যোগের ষষ্ঠ দিনেও উদ্ধারকারীরা নিখোঁজদের সন্ধান করছেন এবং আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ৮টি জেলা থেকেই মৃতদেহ উদ্ধার চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের ভূমিধস বা হিমবাহের কারণে এই দুর্যোগটি ঘটেছে, যা ২৬ অগাস্ট উত্তর ও মধ্য নেপালের শহর ও গ্রামগুলিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এখন পর্যন্ত চিতওয়ান থেকে ২৭২টি, পূর্ব নওয়ালপরাসি থেকে ২০৭টি, পশ্চিম নওয়ালপরাসি থেকে ১৫১টি এবং গোর্খা জেলা থেকে ৬২টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একইভাবে, নুয়াকোট থেকে ৯৫টি, ধাদিঙ থেকে ৫৫টি, তানাহুন থেকে ৩৭টি এবং রাসুয়া থেকে ২৪টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৮৫ জন নিরাপত্তা কর্মী ও ৩২০ জন বিদেশি নাগরিকসহ ৪,২৪৭ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন কর্মীর এখনও খোঁজ মিলছে না
নেপালের নয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯৩৩ জন কর্মীর এখনও খোঁজ মিলছে না। নেপালের National Disaster Risk Reduction and Management Authority জানিয়েছে, হড়পা বানের সময় বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গের মধ্যে ওই কর্মীরা কাজ করছিলেন। বন্যার পর নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকা পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য ভারত তার ফরেনসিক ও টানেল উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের অনুসারে, ১৯ সদস্যের একটি ভারতীয় ফরেনসিক দল কাঠমান্ডুতে কাজ শুরু করেছে। এই দলটি বন্যা দুর্গতদের মৃতদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করতে সহায়তা করবে। এদিকে, ভারতীয় টানেল উদ্ধারকারী দলগুলো চিলিমে ও লাংটাং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে নেপাল সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছে। ২৬ অগাস্ট নেপালের ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীতে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।
নদীর তীর থেকে বিপুল সোনা উদ্ধার
নেপালের ভোটেকোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। বন্যার জল নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী এলাকার কৃষি বিকাশ ব্যাঙ্ক শাখায় ঢুকে পুরো ব্যাঙ্ক চত্বর ডুবিয়ে দেয়। বেশ কয়েকদিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, ব্যাঙ্কের ভেতরে আটকে পড়া কোটি কোটি টাকার সম্পদ নিরাপদে উদ্ধারের জন্য অভিযান শুরু করা হয়। ব্যাঙ্কটি থেকে প্রায় ৫০ কোটি নেপালি রুপি মূল্যের সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, বন্যার কারণে কৃষি বিকাশ ব্যাঙ্কের ত্রিশুলি-ধুঙ্গে শাখাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জল ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে ব্যাঙ্কের লকার ও অন্যান্য অংশে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন ছিল। তা সত্ত্বেও, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট দলগুলো প্রায় আট ঘণ্টা ধরে একটানা অভিযান চালিয়ে ব্যাঙ্কের ভেতরে রাখা মূল্যবান ধাতু ও নগদ টাকা নিরাপদে উদ্ধার করে। আধিকরিকদের মতে, অভিযান চলাকালে প্রায় ৫০ কোটি নেপালি রুপি মূল্যের সোনা, প্রায় দেড় কোটি নেপালি রুপি মূল্যের নগদ টাকা, রুপো এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঙ্ক নথিও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ভোটেকোশি নদীর বন্যায় নেপালের বহু এলাকা প্লাবিত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রবল স্রোতে রাস্তাঘাট ও তার আশপাশের এলাকা ডুবে গেছে। বহু স্থানে বন্যার জল ও ধ্বংসাবশেষ ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান ব্যাহত করেছে। এই বিপর্যয়ের মাঝে, ত্রিশূলীর ব্যাঙ্ক শাখায় সংরক্ষিত কোটি কোটি টাকার সম্পদ নিরাপদে উদ্ধার করাও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্যাঙ্ক শাখাটি ডুবে যাওয়ার পর, সেখানে রাখা সোনা, নগদ টাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের নিরাপত্তাই ছিল সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। উদ্ধারকারী দলগুলো নিজেদের জীবন বিপন্ন করে ব্যাঙ্কের ভেতরে অভিযান চালিয়ে একে একে মূল্যবান জিনিসপত্রগুলো নিরাপদে বের করে আনে।
বিহারে ভেসে এল মাছ
এদিকে নেপালের বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের প্রভাব এখন বিহারেও অনুভূত হচ্ছে। ২৬ অগাস্ট নেপালের রাসুয়া জেলায় আঘাত হানা ধ্বংসযজ্ঞের পর বন্যার জল শুধু কাঠ, গৃহস্থালীর জিনিসপত্র, গ্যাস সিলিন্ডার এবং ধ্বংসাবশেষই নয়, বিশাল আকারের মাছও ভাসিয়ে এনেছে। এখন দাবি করা হচ্ছে যে গণ্ডক নদী এবং এর আশেপাশের এলাকা থেকে শুধু ৪০-৫০ কিলোগ্রাম ওজনের মাছই নয়, বরং ৯০ কিলোগ্রাম এবং এমনকি দেড় কুইন্টাল ওজনের মাছও পাওয়া গেছে। এগুলোর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে। অসংখ্য ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে যে, এই দুর্যোগ হঠাৎ করেই জেলেদের জন্য এক বিরাট সুযোগে পরিণত হয়েছে। বিহারের গোপালগঞ্জের মঙ্গলপুর ঘাট, বাল্মীকিনগর, বাঘাহা ও তার আশেপাশের এলাকাগুলোতে মানুষ এই বিশাল মাছগুলো ধরার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলছেন। অনেক জায়গায় প্রবল স্রোতের কারণে মৃত মাছও পাওয়া গেছে। জেলেরা গোজেতা বা গুঞ্চ ক্যাটফিশ, বাঘর, গ্রাস কার্প, বারালি (ওয়ালগো) এবং রুই মাছের মতো মাছ ধরার খবর দিয়েছেন। কিছু মাছের ওজন ৫ কিলোগ্রাম থেকে শুরু করে কয়েক কিলোগ্রাম পর্যন্ত। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, ১০০ কিলোগ্রামের বেশি ওজনের মাছ এবং এমনকি দেড় কুইন্টাল ওজনের মাছও ধরা পড়েছে।