
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘ডোভাল ডকট্রিন’কে হাতিয়ার করে পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি। এমনই অভিযোগ করলেন পাকিস্তানের প্রাক্তন সেনা আধিকারিক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাজহার জামিল। তাঁর দাবি, ভারত নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করছে। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP) এবং বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA)-এর মতো সংগঠনকে ভারত সমর্থন করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে, ভারতের পরমাণু নীতি এবং ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও একাধিক দাবি করেছেন পাকিস্তানের ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির (NCA) এই উপদেষ্টা।
প্রসঙ্গত, ডোভাল ডকট্রিন (Doval Doctrine) বলতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল-এর সঙ্গে সম্পর্কিত কৌশলগত ধারণাকে বুঝিয়েছেন পাকিস্তানের ওই প্রাক্তন আধিকারিক। এর মূল বক্তব্য হল, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকলেই হবে না, প্রয়োজনে শত্রুপক্ষের চাপ বা হুমকির মোকাবিলায় সক্রিয় পদক্ষেপও করতে হবে। তবে ডোভাল ডকট্রিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত সরকারি নীতিপত্রের নাম নয়। সংবাদমাধ্যম ও কৌশলগত আলোচনায় এই শব্দবন্ধটি বিভিন্ন সময়ে ডোভালের বক্তব্য এবং ভারতের নিরাপত্তা কৌশল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
ভারতকে ঘিরে কী কী অভিযোগ জামিলের?
গত ১৩ অক্টোবর লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (IISS) একটি কর্মশালায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করেন জামিল। দক্ষিণ এশিয়ায় পরমাণু প্রতিরোধ এবং কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিয়ে আয়োজিত ওই কর্মশালায় তিনি দাবি করেন, ভারত নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করে আসছে এবং পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে ডোভালের নামও করেন জামিল। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অজিত ডোভালকে পাকিস্তান যে ভয় পায়, তা নিজের বক্তব্যেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন জামিল।
মাজহার জামিলের দাবি, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করার অভিযোগের পিছনে ভারতের দীর্ঘদিনের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনীকে ভারতের সমর্থন, আশির দশকে এলটিটিই-র সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং ২০০১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা বাহিনীর উপস্থিতির সময় আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের কাছে ভারতের ছ'টি কনস্যুলেট পরিচালনার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।
অপারেশন সিঁদুরে ব্রহ্মস নিয়ে কী দাবি?
অপারেশন সিঁদুরের প্রসঙ্গ তুলে ভারতের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ করেন পাকিস্তানের এই প্রাক্তন সেনা আধিকারিক। তাঁর দাবি, ওই অভিযানে ভারত এমন ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা পরমাণু অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্রে প্রচলিত বিস্ফোরকের পাশাপাশি পরমাণু ওয়ারহেডও বহন করা সম্ভব।
যদিও এই দাবির সঙ্গে প্রকাশ্যে উপলব্ধ তথ্যের অসঙ্গতি রয়েছে। ব্রহ্মস একটি প্রচলিত ওয়ারহেডবাহী সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। ভারতের কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র পরিচালনাকারী স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ডের অংশ হিসেবেও ব্রহ্মস পরিচিত নয়। ফলে অপারেশন সিঁদুরে ব্রহ্মসের পরমাণু ওয়ারহেড ব্যবহারের দাবি প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে তুলে ধরা যায় না।
২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন জামিল। পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় এই বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অপারেশন সিঁদুরের সময় দক্ষিণ এশিয়াকে পরমাণু বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। জামিলের বক্তব্য, পাকিস্তানের কৌশলগত সংযমের কারণেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠেনি।
ভারতের পরমাণু নীতি নিয়েও প্রশ্ন
ভারতের পরমাণু অস্ত্রনীতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামিল। তাঁর বক্তব্য, ভারত পরমাণু সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে প্রথম আঘাত হানার সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে। সুইডেনের গবেষণা সংস্থা SIPRI-র সাম্প্রতিক মূল্যায়নের উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ভারতের পরমাণু ওয়ারহেডের সঙ্গে সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা হয়েছে। সমুদ্রভিত্তিক পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থার টহল বাড়লে ভুল বোঝাবুঝি এবং সামরিক হিসাবের ভুলের আশঙ্কাও বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতের ১৯৯৯ সালের প্রকাশিত খসড়া পরমাণু নীতিতে 'নো ফার্স্ট ইউজ' বা NFU-র কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ, ভারত প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে না, তবে পরমাণু হামলার জবাবে প্রতিশোধমূলক আঘাত হানার নীতি অনুসরণ করবে। পাশাপাশি 'ক্রেডিবল মিনিমাম ডিটারেন্স' বা বিশ্বাসযোগ্য ন্যূনতম পরমাণু প্রতিরোধের কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু ভারতের এই নীতিকে কূটনৈতিক কৌশল বলে ব্যাখ্যা করেছেন জামিল। তাঁর দাবি, ভারতের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন প্রথম আঘাত হানার বিকল্পের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
২০২২ সালের ব্রহ্মস দুর্ঘটনা নিয়েও দাবি
২০২২ সালের মার্চে ভারতীয় বায়ুসেনার একটি ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র দুর্ঘটনাবশত পাকিস্তানের ভূখণ্ডে গিয়ে পড়েছিল। একটি মহড়া চলাকালীন ঘটনাটি ঘটে। ক্ষেপণাস্ত্রটি পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের খানেওয়াল জেলায় গিয়ে পড়ে।
সেই ঘটনাকে 'ইচ্ছাকৃত ব্রহ্মস হামলা' বলে উল্লেখ করেছেন জামিল। যদিও ভারত ওই ঘটনাকে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল।
সৌদি আরব ও তুরস্কের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরব ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রসঙ্গও ওঠে কর্মশালায়। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ হলে এই দুই দেশ পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা করবে কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান জামিল। তিনি বলেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পাকিস্তানের ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির উপদেষ্টা জামিল যে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত, তার চেয়ারম্যান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তবে গত বছরের নভেম্বরে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড গঠনের পর পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের অধীনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।