
পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে 'মক্কা চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেই চুক্তি প্রথমবার বাস্তবায়ন হতে চলেছে। আর তা করতে চলেছে খোদ পাকিস্তান। ইতিমধ্যেই গোটা বিশ্বে এই নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের উপর হুথিরা হামলা চালিয়েছে। তারপরই বয়ান দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি সাফ বুঝিয়ে দিয়েছেন,'মক্কা চুক্তি' অনুযায়ী সৌদি আরবের উপর হামলা বাড়লে বা ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে, এই চুক্তির বাস্তবায়ন হবে। অর্থাৎ হুথিদের উপর একটানা হামলা চালাবে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক।
মঙ্গলবার সৌদি আরবের জ্বালানি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই হামলায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। এরপরই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ স্পষ্ট করে দেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এমন আগ্রাসন চললে পাকিস্তান চুক্তির শর্ত মেনে পদক্ষেপ করতে বাধ্য।
সৌদিতে হামলা মানে পাকিস্তানের উপর হামলা?
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম Geo News-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফকে প্রশ্ন করা হয়, সাম্প্রতিক হুথি হামলার পর মক্কা চুক্তি সক্রিয় করা হতে পারে কি না। উত্তরে তিনি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন। আসিফের বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তিতে কোনও অস্পষ্টতা নেই। চুক্তির অন্যতম নীতি হল, সদস্য দেশগুলির কোনও একটির বিরুদ্ধে আগ্রাসন হলে সেটিকে সব সদস্যের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তিনি বলেন, চুক্তির শর্ত মেনে চলতে পাকিস্তান বাধ্য। প্রয়োজন হলে সেই শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সঙ্গেও আসিফ একই ধরনের মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইয়েমেনের সংঘাত যদি সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মক্কা চুক্তি কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ, পাকিস্তানের বক্তব্যের মূল বিষয় হল- ইয়েমেনে সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের সংঘাত আর শুধু ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
কী এই 'মক্কা চুক্তি'?
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে গত মাসে মক্কা 'জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট' বা 'মক্কা চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির মূল ভাবনা হল, তিন দেশের কোনও একটি সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হলে অন্য সদস্যরা যৌথ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে পাশে দাঁড়াবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই চুক্তিকে পাকিস্তান আগ্রাসী জোট হিসেবে দেখাতে চাইছে না। খাজা আসিফও বলেছেন, চুক্তিটির চরিত্র মূলত প্রতিরক্ষামূলক।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও সদস্য দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হলে অন্য সদস্যরা প্রতিক্রিয়া জানাবে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে কোনও সদস্য দেশ নিজে থেকে অন্য কোনও দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করলে বাকি দুই দেশও সেই যুদ্ধে নেমে পড়বে।
হুথিদের সঙ্গে সৌদির সংঘাত বহু পুরনো
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিদের সংঘাত নতুন নয়। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুথিদের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা ঠেকাতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছিল। কিন্তু সেই অভিযান হুথিদের সম্পূর্ণভাবে দমন করতে পারেনি।
এর পর থেকে হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে মাঝে মাঝেই ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা হয়েছে।
হুথিরা ইরানের সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে তারা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই হুথিদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ভূখণ্ড এবং পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার ফলে সেই পুরনো সংঘাত ফের বড় আকার নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আসল পরীক্ষা হবে ইয়েমেনে অভিযান হলে
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ও কিং ফয়সাল সেন্টারের সহযোগী গবেষক ওমর করিমের মতে, হুথিদের হামলা থেকে সৌদি আরবের উপর উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে 'মক্কা চুক্তি' এবং পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি- দুটিই সক্রিয় হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি, কাতারের অধ্যাপক মেহরান কামরাভার বিশ্লেষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সৌদি আরব যদি ২০১৫ সালের মতো ফের ইয়েমেনে স্থল অভিযান শুরু করে, তাহলে সেটি মক্কা চুক্তির জন্য আসল পরীক্ষা হয়ে উঠবে। কারণ পাকিস্তান স্পষ্ট করেছে, তারা সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পাশে দাঁড়াতে পারে।
অর্থাৎ, সৌদি আরব আক্রান্ত হলে পাকিস্তান পাশে দাঁড়াবে। এই বার্তা ইসলামাবাদ দিয়েছে। কিন্তু সৌদি আরব যদি হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে ঢুকে অভিযান চালায়, তখন পাকিস্তান কী করবে, সেটিই হবে মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্সের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।