
বিরাট চাপে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। পাক অধিকৃত কাশ্মীরকে পাকিস্তানে রাখতে চাইছেন না সেখানকার বাসিন্দারা। এই দাবি নিয়ে পথে নামেন। এদিকে ঘটনার জেরে অস্বস্তিতে পাকিস্তান সরকার ও প্রশাসন। আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁরা প্রয়োজনে বিকল্প পথের দিকেও হাঁটতে পারেন। অনেকের মতে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বা বাণিজ্যিক পথ খোলার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
রাওয়ালাকোটের ইদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশকে সরকার বিরোধী শক্তিশালী প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, পাকিস্তান সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অবহেলা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং প্রশাসনিক দমননীতি চালিয়ে যাচ্ছে তাঁদের সঙ্গে।
'আমাদের পাকিস্তানকে দরকার নেই'
এদিন বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC)-এর নেতা সর্দার আমান খান ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেন। তিনি বলেন, 'পিওকে পাকিস্তানের অংশ নয়। আমাদের পাকিস্তানকে দরকার নেই, বরং পাকিস্তানেরই মরিয়া হয়ে পিওকেকে দরকার।'
তাঁর বক্তব্যে উপস্থিত জনতা করতালিতে ফেটে পড়ে। অনেককে পাকিস্তান-বিরোধী স্লোগান দিতে এবং পতাকা নাড়তেও দেখা যায়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে পিওকের বিভিন্ন এলাকায় সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়েছে। রাওয়ালাকোটে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার মানুষ লাগাতার অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে প্রশাসনের চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
'অন্য পথ' খোলার হুঁশিয়ারি
নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে ৯ জুন থেকে চলা অবস্থান বিক্ষোভের প্রসঙ্গ তুলে আমান খান অভিযোগ করেন, পাকিস্তান প্রশাসন খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের অনাহারে রেখে দমন করার চেষ্টা করছে। তাঁর কথায়, 'আমাদের মহিলা ও শিশুরা আন্দোলন করছেন। তারা বলছে, কাশ্মীরিদের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমি বলছি, আমাদের আপনাদের রেশন দরকার নেই। আপনাদেরই আমাদের দরকার। ভালো করে ভাবুন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় নিয়ে যাবেন না, যেখানে বাকি পথগুলো খুলে যাবে। তখন আপনাদেরই আমাদের কাছে অনুরোধ করতে হবে। অন্য বাণিজ্যপথ খুলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করবেন না।' তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চাইলে জনগণের মতামতকে সম্মান করতে হবে, বলপ্রয়োগ নয়।
পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ওই নেতা আরও জানান,'একবার এক বানরের হাতে দেশলাইয়ের বাক্স তুলে দেওয়া হয়েছিল, আর সে সবকিছুতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। এখন তাদের হাতে মোবাইল ফোন আর টুইটার তুলে দেওয়া হয়েছে। তারা বারবার বলে, কাশ্মীরিদের আগে আনুগত্য প্রমাণ করতে হবে। মনে রাখবেন, কাশ্মীর পাকিস্তানের অংশ নয়। কাশ্মীর পাকিস্তানের সম্পত্তিও নয়।'
খাবার সরবহার বন্ধের অভিযোগ
বিক্ষোভকারীদের দাবি, পাকিস্তান প্রশাসন খাদ্যশস্য, আটা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, আন্দোলন ভাঙতে এবং বাসিন্দাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তাঁদের ৩৮ দফা দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও বড় হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন ওই নেতা।
তবে পাকিস্তান প্রশাসন এই আন্দোলনকে নিরাপত্তাজনিত ইস্যু হিসেবে দেখছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে,JAAC সংগঠনটিকে চলতি মাসে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর আমান খান-সহ সংগঠনের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, অর্থনৈতিক সমস্যার বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হওয়ায় সেটিকে দমন করতেই এই আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এছাড়া, জুনের শুরু থেকেই পিওকের বিভিন্ন এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও যাতে বাইরের বিশ্বের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সেই উদ্দেশ্যেই এই যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত করা হয়েছে।
কেন উত্তপ্ত পিওকে?
এই আন্দোলন হঠাৎ করে শুরু হয়নি। বহু বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভ থেকেই এর জন্ম। বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই পিওকের মানুষ গম, আটা ও বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকির দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য, অঞ্চলটি বিপুল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও তার বড় অংশ পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে পাঠানো হয়, অথচ স্থানীয় মানুষকে বেশি বিল দিতে হয়। আগের বিভিন্ন সমঝোতা অনুযায়ী দেওয়া প্রতিশ্রুতি ইসলামাবাদ রক্ষা করেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC)-কে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়। যদিও JAAC সব অভিযোগ অস্বীকার করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়, যখন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ নাকি মন্তব্য করেন যে রাওয়ালাকোট ও মিরপুরের বাসিন্দারা 'প্রকৃত কাশ্মীরি নন।' এই মন্তব্য গোটা অঞ্চলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।