
আমেরিকায় হিন্দু মন্দিরে বন্দুক নিয়ে হামলা চালিয়ে গণহত্যার ছক কষার অভিযোগে গ্রেফতার ১৯ বছরের এক যুবক। এই ঘটনায় ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এবং বর্ণবিদ্বেষমূলক হিংসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল ভারত সরকার। বৃহস্পতিবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, আমেরিকার ইলিনয় প্রদেশের অরোরায় একটি হিন্দু মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার খবর বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অভিযুক্তের পরিকল্পনায় হিন্দু-বিরোধী মনোভাব এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের বিরুদ্ধে হিংসার উল্লেখ ছিল বলে অভিযোগ। আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন প্রশাসনকে আরও সতর্ক হওয়ার এবং বিদ্বেষপ্রসূত হিংসার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করার আর্জি জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার মতো পদক্ষেপ সম্পর্কে ভারত অবগত। তবে এই ঘটনার কথিত বর্ণবিদ্বেষমূলক ও হিন্দু-বিরোধী চরিত্র বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষ এবং ভারত-বিরোধী বিদ্বেষ বাড়ছে বলে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, এই ঘটনা তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিদ্বেষমূলক হিংসার বিরুদ্ধে কোনও রকম আপস না করে ভারতীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ করা প্রয়োজন।
১৯ বছরের যুবকের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?
সংবাদসংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্তের নাম আলেকজান্দ্রোস পাপোরাকিস। সে ইলিনয়ের পালাটাইন এলাকার বাসিন্দা। গত ১১ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তদন্তকারীরা তার কাছ থেকে আট পাতার একটি ম্যানিফেস্টো উদ্ধার করেছেন বলে জানা গিয়েছে। ওই নথিতে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মতাদর্শের উল্লেখ ছিল বলে অভিযোগ। পাশাপাশি, ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের বিরুদ্ধে হিংসার কথাও সেখানে লেখা ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
মাউন্ট প্রসপেক্ট পুলিশের কাছে এক ব্যক্তি অভিযুক্তের কিছু উদ্বেগজনক বার্তার কথা জানান। তার পরেই তদন্ত শুরু হয়। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত একটি নথি ভাগ করে নিয়েছিল, যেখানে গুলি চালিয়ে হামলার পরিকল্পনার কথা লেখা ছিল। সেই সঙ্গে একটি রাইফেল, ম্যাগাজিন, বডি আর্মার এবং কৌশলগত সরঞ্জামের ছবিও ছিল।
পালাটাইন পুলিশের দাবি, তদন্তকারীদের ধারণা, ১১ অক্টোবর হামলা চালানোর পরিকল্পনা করে থাকতে পারেন ওই যুবক। সম্ভাব্য লক্ষ্য ছিল অরোরার কোনও হিন্দু উপাসনাস্থল। তবে ঠিক কোন মন্দিরকে নিশানা করার পরিকল্পনা ছিল, তা এখনও নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তকারীরা।
হামলার চেষ্টা, বিকল হয়ে যায় রাইফেল?
আমেরিকার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পালাটাইনে তার মায়ের বাড়ি থেকে প্রায় ৪০ মাইল গাড়ি চালিয়ে অরোরার একটি হিন্দু মন্দিরের কাছে পৌঁছেছিল অভিযুক্ত। তার কাছে একটি পরিবর্তিত AR-ধাঁচের রাইফেল, প্রায় ৩০০ রাউন্ড গুলি এবং বডি আর্মার ছিল বলে ওই প্রতিবেদনগুলিতে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুলি চালানোর চেষ্টা করার সময় রাইফেলটি বিকল হয়ে যায়। এর পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় অভিযুক্ত। পরে অনলাইনে রাইফেলটি কীভাবে ঠিক করা যায়, তা খোঁজার চেষ্টা করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তের বাড়ি থেকে একটি রাইফেল, গুলিভর্তি ম্যাগাজিন, কয়েকশো রাউন্ড গুলি এবং কৌশলগত সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তবে হামলার পরিকল্পনা এবং অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে তদন্ত চলছে।
কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে?
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী হুমকি দেওয়া এবং রাইফেল-সংক্রান্ত বেআইনি অস্ত্র রাখার অভিযোগে একটি করে মামলা দায়ের হয়েছে। বুধবার আদালতে শুনানির পর বিচারক তাকে হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। আগামী ৩০ অক্টোবর তার পরবর্তী আদালতে হাজিরার দিন ধার্য হয়েছে।
এই ঘটনায় আরও কোনও অভিযোগ আনার প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে FBI-এর সঙ্গে কাজ করছে পুলিশ। তবে এই মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত জনসাধারণের জন্য বর্তমানে কোনও নির্দিষ্ট ও চলমান বিপদের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ঘটনার পর আমেরিকায় ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে শিকাগোর ভারতীয় কনস্যুলেট। মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করে কনস্যুলেট জানিয়েছে, ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং পরিস্থিতির উপর নজরদারি চলছে।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাজা কৃষ্ণমূর্তি এই হামলার কথিত পরিকল্পনার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যাঁরা পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন, তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এবং শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী মনোভাবের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটার জন্য অপেক্ষা না করে এই ধরনের বিদ্বেষকে গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনও পুলিশের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে সতর্ক থাকতে এবং সন্দেহজনক কিছু নজরে এলে কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য সম্প্রদায়ের সদস্যদের আর্জি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষেরই ভয় ছাড়া নিজেদের উপাসনাস্থলে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।