
খাতায় কলমে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে বটে। তবে ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz)-তে সংঘাত থামার লক্ষণ নেই। গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের এই অতি সংবেদনশীল জলপথে পর পর তিনটি বাণিজ্যিক তেল ও গ্যাস ট্যাঙ্কারের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটল। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নজরদারি সংস্থা ‘ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’ (UKMTO) জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হরমুজ প্রণালীতে একটি ট্যাঙ্কার অজ্ঞাতপরিচয় উড়ন্ত বস্তু বা ড্রোন (UAV) দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এই হামলায় জাহাজটির কাঠামো বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনও প্রাণহানি বা খনিজ তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর মেলেনি। তবে ওমান উপকূলের এই ঘটনায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি (LNG)-র সরবরাহ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত মাসেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি (MoU) হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল স্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা। কিন্তু গত সপ্তাহে কাতারে হওয়া পরোক্ষ বৈঠকটি কোনও রফাসূত্র ছাড়াই ভেস্তে যাওয়ার পরেই সাগরে এই চোরাগোপ্তা হামলা শুরু হয়েছে।
‘মে ডে, মে ডে…!’
মঙ্গলবারের এই ধারাবাহিক হামলার সবচেয়ে বিপজ্জনক শিকার হয়েছে কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত এলএনজি পরিবাহী জাহাজ ‘আল রেখায়াত’ (Al Rekayyat)। ওমান উপকূলে জাহাজটির ইঞ্জিন রুমের ঠিক ওপরে একটি ড্রোন আছড়ে পড়ে এবং দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা অডিও বার্তায় জাহাজের ক্যাপ্টেনের আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়, যেখানে তিনি বারবার ব্যাকুল হয়ে বলছেন, “মে ডে, মে ডে, মে ডে! আমরা ড্রোন হামলার শিকার হয়েছি, ইঞ্জিন রুম ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা সম্ভব হচ্ছে না।”
লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসে ঠাসা থাকায় জাহাজটি যেকোনোও মুহূর্তে ভয়াবহ বিস্ফোরণের মুখে পড়তে পারত। তবে শেষ পর্যন্ত সমস্ত ক্রু-সদস্যদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনার পর ইউরোপের বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এক ধাক্কায় ৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কাতারের পাশাপাশি সৌদি আরবের একটি ক্রুড অয়েল ট্যাঙ্কার ‘উইদয়ান’ (Wedyan)-ও এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর।
ইরানকে দায়ী করল কাতার
চলতি বছরের গোড়ার দিকে মার্কিন-ইজরায়েল সংঘাতের সময় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর এই প্রথম ওই এলাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে বড়সড় হামলা হলো। কাতারের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি সরাসরি ইরানকে কাঠগড়ায় তুলে এই ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ বলে তীব্র নিন্দা করেছেন।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী সমস্ত জাহাজ থেকে স্থায়ী ট্রানজিট ফি বা কর আদায়ের জন্য ওই এলাকায় একটি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কায়েম করতে চাইছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)। সেই কারণেই এই চাপ তৈরির কৌশল।
‘এক ঘণ্টাতেই গুঁড়িয়ে দেব!’
সমুদ্রে এই উত্তেজনার পারদ চড়তেই ওভাল অফিস থেকে কড়া বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কূটনীতি ব্যর্থ হলে ইরানের বিরুদ্ধে ফের সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “হয় চুক্তি করো, নয়তো কাজ শেষ করতে দাও। আমরা চাইলে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ওদের সমস্ত সেতু ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধূলিসাৎ করে দিতে পারি।” তবে মার্কিন সামরিক চাপ ও হুমকির মুখে কোনও আলোচনা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।