
কখনও অত্যাধিক গরম। কখনও আবার অস্বাভাবিক বৃষ্টি। বিশ্বের এক প্রান্তে খরা, অন্য প্রান্তে প্রবল বন্যা। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এর পিছনে আছে 'এল নিনো'। কিন্তু এই এল নিনো কী? অনেকের মনেই ভুল ধারণা রয়েছে। চায়ের দোকানে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, অনেকে বলছেন, 'আরে হবে না? এল নিনো ঘূর্ণিঝড় আসছে যে!' না... বলাই বাহুল্য এল নিনো কোনও ঘূর্ণিঝড় নয়। তাহলে এল নিনো আসলে কী? কীভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়? প্রভাবই বা কোথায় পড়ে?
সহজ ভাষায় বললে, এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়া। এর প্রভাব পড়তে পারে বাতাসের গতিপথ এবং বৃষ্টির ধরনেও। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ বদলে যেতে পারে।
এল নিনো কোথায় তৈরি হয়?
এল নিনোর মূল কেন্দ্র প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অংশ। সাধারণ পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বাণিজ্যিক বায়ু প্রবাহিত হয়। সেই বাতাস সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্ণ জলকে পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়।
ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম দিকে উষ্ণ জল জমা হয়। অন্য দিকে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছে সমুদ্রের গভীর থেকে তুলনামূলক ঠান্ডা জল উপরে উঠে আসে।
কিন্তু কোনও কোনও সময়ে এই স্বাভাবিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায়। তখন পশ্চিম দিকে উষ্ণ জল ঠেলে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও কমে। প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের উপরিভাগের জল ধীরে ধীরে বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিকেই বলা হয় এল নিনো।
নাম ‘এল নিনো’ কেন?
‘El Niño’ স্প্যানিশ শব্দ। এর অর্থ ‘ছোট ছেলে’ বা ‘দ্য বয়’। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের জেলেদের মধ্যে বহু বছর আগে এই নামের প্রচলন হয়।
ক্রিসমাসের সময়ের কাছাকাছি এই উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের প্রভাব দেখা যেত বলে এর সঙ্গে শিশু যিশুর নামেরও একটি ধর্মীয় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সেখান থেকেই ‘এল নিনো’ নামটি জনপ্রিয় হয়।
এল নিনো হলে কী হয়?
এল নিনোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে আবহাওয়ায়। সমুদ্রের তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের আচরণও বদলে যায়। এর ফলে কোথাও বেশি বৃষ্টি হতে পারে। আবার কোথাও বৃষ্টির পরিমাণ কমে যেতে পারে।
দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে এল নিনোর সময় অতিবৃষ্টি এবং বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আবার প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমের বিভিন্ন এলাকায় খরা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে।
তবে প্রতিটি এল নিনো পর্বে একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হবে, এমন নয়। এর শক্তি, সময়কাল এবং অন্যান্য আবহাওয়াগত পরিস্থিতির উপর প্রভাবের ধরন নির্ভর করে।
ভারতের এল নিনোর প্রভাব
ভারতের ক্ষেত্রেও এল নিনো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে আবহাওয়াবিদদের নজর থাকে।
ঐতিহাসিক ভাবে অনেক এল নিনো পর্বের সঙ্গে ভারতে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টির সম্পর্ক দেখা গিয়েছে। বর্ষা দুর্বল হলে কৃষি থেকে জল সরবরাহ; বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এল নিনো হলেই ভারতে বৃষ্টি কম হবেই, এমন সরল নিয়ম নেই। ভারতীয় বর্ষা একটি অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা। ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি, বায়ুর গতিপথ, তাপমাত্রা এবং আরও অনেক বিষয় বর্ষার উপর প্রভাব ফেলে।
তাই কোনও একটি কারণ দিয়ে পুরো বর্ষার চরিত্র ব্যাখ্যা করা যায় না।
এল নিনো মানেই খারাপ?
না। এল নিনোকে শুধুমাত্র ‘খারাপ আবহাওয়া’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব আলাদা হতে পারে।
কোনও জায়গায় অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে জলাধার ভরে যেতে পারে। আবার অন্য কোনও অঞ্চলে খরা দেখা দিতে পারে। কোথাও শীতের তাপমাত্রার ধরনও বদলে যেতে পারে।
এল নিনোর বিপরীত পরিস্থিতির নাম ‘লা নিনা’। তখন প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রের উপরিভাগের জল স্বাভাবিকের তুলনায় ঠান্ডা হয়ে যায়। এল নিনো এবং লা নিনা; দুই ঘটনাই বৃহত্তর ‘ENSO’ বা El Niño–Southern Oscillation সিস্টেমের অংশ।
অর্থাৎ, এল নিনো কোনও সাইক্লোন বা নিম্নচাপ নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বড় পরিবর্তন। আর তার প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বায়ু এবং বৃষ্টির গতিপথ বদলে যেতে পারে।