
একুশে 'মেজোবোন' নন্দীগ্রামে পরাজয়ের পর, ছাব্বিশে 'বড়বোন' ভবানীপুরেও হারলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তা-ও সেই শুভেন্দু অধিকারীর কাছেই। ৫ বছর আগে দুই কেন্দ্রে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নিজের খাসতালুক ভবানীপুরকে এই নামই দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দুই 'বোন'ই মমতাকে ফেরাল খালি হাতে। কিন্তু নিজের গড়ে কেন এমন শোচনীয় পরাজয় হল?
নিজের প্রাক্তন দলনেত্রীকে তাঁরই গড়ে হারিয়ে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। গোটা রাজ্যে BJP-র কাছে তৃণমূলের পরাজয়ের পাশাপাশি ভবানীপুরের এই হারও বড়সড় আঘাত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। তাঁর বাসভবন কালীঘাটও ভবানীপুর কেন্দ্রেরই অন্তর্গত। যুব কংগ্রেস করার দিনগুলি থেকে এই কালীঘাট-ভবানীপুর অঞ্চলেই রাজনীতিতে উত্থান হয় মমতার। ফলে সেখানেই শুভেন্দুর কাছে হার লজ্জাজনক তো বটেই।
'মিনি ইন্ডিয়া' হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর আসনের লড়াইটা যদিও ছিল হাড্ডাহাড্ডি। সোমবার দিনভর টানটান উত্তেজনা চলছিল এই কেন্দ্রের কাউন্টিং ঘিরে। পোস্টাল ব্যালট খোলার পর থেকে সকালে শুভেন্দু অধিকারী বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর সপ্তম রাউন্ডের কাউন্টিংয়ের পর থেকে দ্রুত লিড কভার করে ফেলেন মমতা। একটা সময়ে ১৯ হাজার ভোটে এগিয়ে যান তিনি। মনে হয়, তিনি সহজ জয় পেয়ে যাবেন ভবানীপুরে। তবে খেলা ঘোরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে। তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে শুভেন্দু অধিকারীর মাত্র ২ হাজার ৯০০ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। রাত ৯টায় ১৮ রাউন্ড গণনার পর শুভেন্দু প্রায় ১১ হাজার ভোট হেরে যান।
ফাইনাল রেজাল্ট ঘোষণার পর দেখা গেল, শুভেন্দু ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে হারালেন মমতাকে।
আরজি করের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নারী সুরক্ষা নিয়ে মমতার ইমেজ ধ্বংস করেছিল। ভবানীপুরে তাঁর এই লজ্জার হার সেই ইমেজকে আরও নষ্ট করে ফেলল, এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
SIR প্রক্রিয়া এবং ভোটার স্ক্রুটিনি, ভবানীপুরের ডেমোগ্রাফি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এই কেন্দ্রে মমতা বিরোধী ভোটের নেপথ্য়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে থাকতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। সর্বোপরি শাসক বিরোধী ভোট BJP-র জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।
'মিনি ইন্ডিয়া' ভবানীপুরে SIR-এ ভোটার ডিলিট হওয়া বড় ফ্যাক্টর?
দক্ষিণ কলকাতার এই বিধানসভা কেন্দ্রে ভারতের সমস্ত কমিউনিটির মানুষজনের বসবাস। এই কেন্দ্রের ৪২ শতাংশ বাসিন্দা বাঙালি হিন্দু, ৩৪ শতাংশ অবাঙালি হিন্দু। এক চতুর্থাংশ মুসলিম এবং এছাড়াও রয়েছে বিহারী, ওড়িয়া এবং ঝাড়খণ্ডের ভোটার।
তবে এবার কেবলমাত্র গুজরাতি এবং মারওয়াড়িনাই নয়, বাঙালি হিন্দুদের একটা বড় অংশ শুভেন্দুর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তা কার্যত প্রমাণিত। তৃণমূলের প্রতি ক্ষোভ থেকে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তরাও ভোট দিয়েছে BJP-কে। আবার অবাঙালি বহুতলের বাসিন্দারাও ঢেলে ভোট করেছেন শুভেন্দুকে। ফলে 'ঘরের মেয়ে' মমতা নিজের ঘরেই হেরে গিয়েছেন।
ভবানীপুরে SIR-এর জেরে বাদ পড়েছে ৪৭ থেকে ৫১ হাজার নাম। সেটাও বড় ফ্যাক্টর ছিল।
মমতাকে চক্রব্যুহে কীভাবে ফাঁসাল BJP?
খাসতালুক ভবানীপুরকে প্রেস্টিজ ব্যাটলগ্রাউন্ডে পরিণত করেছিল BJP। মাসের পর মাস ধরে ভবানীপুরের ম্যাপ নিয়ে অঙ্ক কষেছে তারা। এর আগে মমতার বিরুদ্ধে কখনও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে দাঁড় করায়নি BJP। তবে এবার নিজেদের সেরা প্রার্থীকে নামিয়ে দেয় তারা।
বুথ স্তরের শক্তপোক্ত পাটিগণিত, মুসলিম বিরোধী ভোট, নিজের হেভিওয়েট সত্তার মতো স্ট্র্যাটেজিগুলির উপর ভর করে শুভেন্দু মমতাকে হারাতে সক্ষম হন বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক কারবারিরা। এভাবেই মমতাকে চক্রব্যুহে আটকে ফেলে গেরুয়া শিবির।
একটা মিটিংয়ের মাঝপথে মমতা মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যান। তিনি বলেছিলেন, 'এরা আমায় মিটিং পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না। যদি পারেন ভোটটা আমায় দেবেন।' তাঁর এই বক্তব্য কি হারের পূর্বাভাস পেয়ে ভিক্টিম কার্ড খেলা ছিল? এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের অধিকাংশ।