
ভারতীয় রাজনীতিতে একটি বিশ্বাস ক্রমেই গেঁড়ে বসছিল, তা হল মহিলাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা জমা করার মতো স্কিম নিয়ে এলে তা সরকার রক্ষার 'অব্যর্থ দাওয়াই'। কিন্তু সেই 'দাওয়াই' ফেল করল বঙ্গে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়ে নজির গড়ল পশ্চিমবঙ্গ। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের আওতায় মহিলাদের প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা দেওয়া হলেও তার কোনও লাভ পেল না তৃণমূল কংগ্রেস। ভোটের ফলাফল দেখে অনুমান করা হচ্ছে, মহিলা ভোট সঙ্গ ছেড়েছে বিজেপির।
১৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে ক্ষমতার পালাবদল। ছাব্বিশের নির্বাচনে তৃণমূল ১০০ আসনের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি। মনে করা হচ্ছিল, দুটি ‘এম-ফ্যাক্টর’ মমতার জয় নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। প্রথমটি হল মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক ও দ্বিতীয়টি হল মহিলা ভোটব্যাঙ্ক। এরমধ্যে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক মমতার সঙ্গে থাকলেও, মহিলা ভোটব্যাঙ্ক সরে গিয়েছে তৃণমূলের পাশ থেকে। কিন্তু দেশের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর পাশ থেকে মহিলারা কেন সরে গেলেন? উত্তর বুঝে নেওয়া যাক।
অসমে মহিলাদের জন্য 'অরুণোদয়'স্কিম হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং বিজেপির জন্য দুর্দান্ত কাজ করেছে। বিহারেও মহিলাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ১০ হাজার টাকা নগদ দেওয়া ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে বলেই বিশ্বাস করেন রাজনৈতিক সচেতকরা। তবে বাংলায় ছাব্বিশের নির্বাচনে দাগ কাটতে পারল না 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যোজনা'।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের লক্ষ্য ছিল, বাংলার অর্ধেক জনসংখ্যাকে আর্থিকভাবে যুক্ত রাখা ও ক্ষমতার চাবি নিজের দখলে রাখা। কিন্তু তা ঘটেনি। বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, মহিলাদের জন্য আর্থিক সহায়তার চেয়ে তাঁদের পরিচয়ের প্রশ্নটি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাত্র ১৫০০ টাকার পরিবর্তে যখন মহিলাদের মৌলিক অধিকারে আঘাত লাগে, তখন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করা টাকা সেই ক্ষতে মলম লাগাতে পারেনি।
আরজি কর ঘটনা:
আর জি কর মেডিকেল কলেজের ঘটনা শুধু কলকাতা নয়, সমগ্র বাংলাকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল। এটি শুধুমাত্র ধর্ষণের ঘটনা নয়, বরং সেই ব্যবস্থার উপরই আঘাত যার মূলে ছিল 'দিদি'-র মাতৃসুলভ প্রতিচ্ছবি। বাংলার নারীরা, বিশেষ করে জেন জি প্রজন্ম অনুভব করেছে, যে সরকারকে তাঁরা নিজেদের রক্ষাকর্তা বলে মনে করত, সেই সরকারই এই বিষয়ে কিছু 'ঘোঁট' পাকাচ্ছে। যখন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন করতে এগিয়ে এলেন, তখন 'কভার ফায়ার' বা আড়াল করার ধারণার জন্ম হয়। রাজ্যের মহিলাদের মধ্যে বার্তা যায়, একজন মহিলা চিকিৎসক যেখানে নিজের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সুরক্ষিত নয়, সেখানে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার -এর গুরুত্ব কোথায়?
মহিলাদের উপর হওয়া অত্যাচার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহিলাদের উপর হওয়া অত্যাচারের ঘটনাকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ছিল অন্যতম একটি বড় ভুল। সন্দেশখালি থেকে আর জি কর-এর মতো ঘটনাকে রাজ্যের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা বলে উড়িয়ে দেওয়ার মতো প্রবণতা যে বাংলার মানুষ ভালোভাবে নেয়নি, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জনতার রায়ে।