কালিম্পং শহরের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে, কুয়াশা আর পাইন অরণ্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক অপূর্ব পাহাড়ি গ্রাম, নকদারা (Nokdara)। শহরের ভিড়, যানজট আর ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে যাঁরা শান্ত প্রকৃতির কোলে সময় কাটাতে চান, তাঁদের কাছে নোকদারা ধীরে ধীরে আদর্শ গন্তব্য হয়ে উঠছে।
কালিম্পং শহর থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই অফবিট জায়গাটিকে অনেক পর্যটকই আদর করে বলেন, ‘ঈশ্বরের নিজের হাতে আঁকা ছবি’। চারদিকে পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর কুয়াশার চাদরে মোড়া পরিবেশ নকদারাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে উত্তরবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে।
নকদারা নামের উৎপত্তিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। লেপচা ভাষার ‘নোক হ্লো’ শব্দ থেকে এসেছে নকদারা, যার অর্থ ঠান্ডা বা কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়। আবার নেপালি ভাষায় ‘দারা’ শব্দের অর্থ পাহাড়। নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এই জায়গার প্রকৃতি ও আবহাওয়ার পরিচয়।
নকদারার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা শান্ত নীল নোকদারা লেক। এটি একটি কৃত্রিম বোটিং লেক হলেও তার চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একে করে তুলেছে অত্যন্ত মনোরম। লেকের জলে আকাশ আর পাহাড়ের প্রতিবিম্ব দেখতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে দিন দিন।
লেককে ঘিরে রয়েছে ঘন পাইন বন, যা গোটা এলাকাটিকে আরও নিস্তব্ধ ও শীতল করে তোলে। পাইন পাতার ফাঁক গলে আসা হালকা রোদের আলো, দূরে পাখির ডাক, সব মিলিয়ে নকদারার পরিবেশ যেন শহুরে জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত এক জগৎ।
আকাশ পরিষ্কার থাকলে নকদারা থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য। সকালের আলোয় কিংবা বিকেলের সোনালি রোদে তুষারশৃঙ্গের রং বদলের খেলা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। প্রকৃতিপ্রেমী ও ফটোগ্রাফারদের কাছে এই দৃশ্য একেবারে স্বপ্নের মতো।
যাতায়াতের দিক থেকেও নকদারা এখন তুলনামূলক সহজলভ্য। নিউ জলপাইগুড়ি বা বাগডোগরা থেকে গাড়ি করে প্রথমে কালিম্পং পৌঁছে, সেখান থেকে লোকাল ক্যাব বা ছোট গাড়িতে নোকদারা যাওয়া যায়। থাকার জন্য এখানে গড়ে উঠেছে একাধিক হোমস্টে, যেখানে স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতির স্বাদ পাওয়া যায়।
সারা বছরই নকদারার আবহাওয়া মনোরম থাকে। তবে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। আবার মার্চ ও এপ্রিলে পাহাড় জুড়ে রডোডেনড্রন ও অর্কিডের রঙিন সমারোহ নোকদারাকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলে। ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে শান্ত পাহাড়ি পরিবেশে সময় কাটাতে চাইলে নোকদারা নিঃসন্দেহে এক অনন্য ঠিকানা।