
১৯৬০ সালে অরুণ ঘোষ (Arun Ghosh) সই করেন ইস্টবেঙ্গলে (East Bengal)। মোহনবাগান (Mohun Bagan) পরিবার, সকলেই সবুজ-মেরুনের সমর্থক। এমন এক ফুটবলারকে লাল-হলুদ সই করিয়ে নেওয়ায় হকচকিয়ে যান মোহনবাগান কর্তারা। রাগে বসুশ্রী সিনেমা হল ঘেরাও করেন মোহনবাগান কর্মকর্তারা। সেই তালিকায় ছিলেন প্রবাদপ্রতীম শৈলেন মান্নাও।
কীভাবে অরুণ ঘোষকে সই করায় ইস্টবেঙ্গল
আসলে ইস্টবেঙ্গলের লক্ষ্য ছিল টি.এ রহমান। তাঁর দারুণ খেলায় মুগ্ধ সকলেই। টাকা-পয়সা নিয়ে মোহনবাগানের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। টার্গেট করার পর রহমানের সঙ্গে কথাও বলেন ইস্টবেঙ্গল কর্তারা। ঠিক হয় সই করবেন এই ডিফেন্ডার। যদিও শেষ মুহূর্তে তা হয়নি। রহমানের সঙ্গে টাকা-পয়সার সমস্যা মিটিয়ে ফেলে মোহনবাগান।
কিন্তু পাল্টা আঘাত দিতে হবে মোহনবাগানকে। সেই জন্যই আরেক ডিফেন্ডার অরুণ ঘোষকে টার্গেট করে ইস্টবেঙ্গল। ইতিমধ্যেই বেশ নাম করেছেন অরুণ। ডুরান্ড কাপ ও রোভার্সে দারুণ খেলায় ইস্টবেঙ্গল তাঁকে টার্গেট করে। মোহনবাগান বুঝতেই পারেনি ইস্টবেঙ্গল তাদের এই ডিফেন্ডারের দিকে হাত বাড়াবে। সাইডব্যাককে সই করাতে তৎপর হয়ে ওঠে লাল-হলুদ। গাড়ি নিয়ে হাওড়ার শিবপুরে চলে যান ইস্টবেঙ্গল কর্তারা।
সেই সময় অরুণ ঘোষের বাবা অসুস্থ। সেই খবরও পেয়ে গিয়েছিলেন লাল-হলুদ কর্তারা। পাশেই একটা ডাক্তার খানায় বাবার জন্য ওষুধ আনতে গিয়েছিলেন অরুণ। সেখানেই তাঁকে ধরেন ইস্টবেঙ্গল কর্তারা। কথাও হয় তাদের। ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের সাহায্য করেছিলেন তাঁর দিদি।
অরুণ ঘোষের জার্সি খুলে নেওয়া হয়েছিল
অরুণ ঘোষের জার্সি খুলে নিয়েছিলেন মোহনবাগান অধিনায়ক সুশীল গুহ। মোহনবাগান কর্তা ও কোচ চেয়েছিলেন অরুণ খেলুন সেই ম্যাচে। কিন্তু সুশীল গুহ তাঁর জার্সি খুলে নেন বলে শোনা যায়। এই ঘটনার কথাই আরও একবার মনে করিয়ে দেন ইস্টবেঙ্গল কর্তারা। এতেই কাজ হয়। সেই অপমান আর মেনে নিতে পারেননি অরুণ। তবে একটি শর্ত দেন সাইডব্যাক। তিনি জানিয়ে দেন, রহমান সই করলে তিনি খেলবেন না। কারণ ততদিনে সকলেই জেনে গিয়েছিল রহমান সই করছেন ইস্টবেঙ্গলে। তবে তা যে হচ্ছে না তা জানা ছিল ইস্টবেঙ্গল কর্তাদের। তাই সেই শর্ত মেনে নেন কর্তারা। বসুশ্রী সিনেমা হলে রাখা হয়েছিল অরুণকে।
পরের দিন সকাল ১০টায় আইএফএ অফিস খুলতেই সই করানো হয় অরুণ ঘোষকে। তখনও এই ঘটনার কথা জানতেন না মোহনবাগান কর্তারা। অরুণ ঘোষের ইস্টবেঙ্গলে সই করার কথা জানতেই বসুশ্রী সিনেমা হলেন জড়ো হয়ে যান সবুজ-মেরুন সদস্য কর্তারা। প্রায় সব কর্মকর্তা চলে আসেন সেখানে। শোনা যায় ধীরেন দে, শৈলেন মান্নাও ছিলেন সেই ভিড়ে। ছিলেন অরুণ ঘোষের দাদাও। তিনি চিৎকার করতে থাকেন, 'অরুণ বেরিয়ে আয়। বাবার শরীর খারাপ।' অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে পেছনের দরজা দিয়ে ঘুমন্ত অরুণকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান ইস্টবেঙ্গল কর্তা সুজন বন্দ্যোপাধ্যায়। গাড়ি নিয়ে সোজা নাকতলায় পৌঁছে যান সুজন। ইস্টবেঙ্গলের আরেক ফুটবলার শুভাশিস গুহর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় অরুণকে।
সইয়ের পরেও কেন সমস্যা হয়েছিল অরুণ ঘোষের?
তখন নিয়ম এখনকার মতো ছিল না। সই করার দশ দিনের মধ্যে দল পরিবর্তন করা যেত। আর সেই জন্যই ইস্টবেঙ্গল কর্তারা অরুণ ঘোষকে ছাড়তে চাননি লাল-হলুদ কর্তারা। সেই জন্যই কর্তারা বুঝতে পেয়ে গিয়েছিলেন, কলকাতায় কোনোও ভাবেই রাখা যাবে না অরুণকে। পরেরদিন সকালে অরুণকে নিয়ে উত্তরবঙ্গে চলে যান সুজন-শুভাশিসরা। বিমানে করে অরুণকে নিয়ে যাওয়া হবে বলে ঠিক করা হলেও, বিমানবন্দরে ঢোকার মুখে সুজনরা দেখতে পান, বাইরে দাঁড়িয়ে মোহনবাগান কর্তারা। দেখে ডানদিকে না ঘুরে সোজা গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যান সুজনরা। পেছনে তাড়া করেন মোহনবাগান কর্তারা। মধ্যমগ্রাম, বারাসাত পেরিয়ে জাগুলিয়ার কাছে এসে হাল ছাড়েন মোহনবাগান কর্তারা।
(তথ্য সূত্র: প্রখ্যাত সাংবাদিক- বিপ্লব দাসগুপ্ত)