চাকরি জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর প্রত্যেকটি মানুষের কাছেই নিয়মিত আয়ের উৎস বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। বর্তমান বাজারে নানা ধরনের লগ্নি বা বিনিয়োগের মাধ্যম থাকলেও তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শেয়ার বাজারের মতো নানা আর্থিক ঝুঁকি জড়িয়ে থাকে। তবে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ভারত সরকারের ডাকঘর বা পোস্ট অফিস এমন একটি অসাধারণ সঞ্চয় প্রকল্প নিয়ে এসেছে যেখানে কোনো রকম আর্থিক ঝুঁকি বা রিস্ক ছাড়াই বিপুল পরিমাণ রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। এই সরকারি প্রকল্পের নাম হলো পোস্ট অফিস সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম বা এসসিএসএস যা দেশের প্রবীণ মানুষদের অবসর জীবনকে আর্থিক দিক থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করতে অত্যন্ত সাহায্য করে।
পোস্ট অফিসের এই বিশেষ সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো যে এটি একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যম। এই সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে টাকা রাখলে লোকসানের বা মূলধন খোয়ানোর কোনো রকম ভয় বা ঝুঁকি থাকে না। কোনো প্রবীণ নাগরিক যদি নিজের জীবনের সঞ্চিত পুঁজি থেকে মাত্র একবার এই প্রকল্পে একটি বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেন তবে তিনি প্রতি মাসে বা প্রতি তিন মাস অন্তর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নিশ্চিত টাকা নিয়মিত আয় হিসেবে ঘরে তুলতে পারবেন। বর্তমানে প্রবীণ নাগরিকদের এই সঞ্চয় প্রকল্পের ওপর বার্ষিক ৮.২ শতাংশ হারে চমৎকার সুদের সুবিধা দিচ্ছে ভারত সরকার।
যদি কোনো বিনিয়োগকারী বা প্রবীণ নাগরিক এই সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিমে এককালীন সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন তবে সুদের অংকটি বেশ আকর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায়। বার্ষিক ৮.২ শতাংশ সুদের হার অনুযায়ী ৩০ লাখ টাকার বিনিয়োগের ওপর প্রতি বছর মোট ২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা শুধুমাত্র সুদ হিসেবেই পাওয়া যাবে। এই বিপুল পরিমাণ সুদের টাকাকে যদি বারোটি মাসের হিসেবে ভাগ করে নেওয়া যায় তবে প্রতি মাসে প্রবীণ নাগরিকরা প্রায় ২০ হাজার ৫০০ টাকা করে নিশ্চিত নিয়মিত আয় বা মান্থলি ইনকাম পেতে পারেন। তবে সরকারের নিয়ম অনুযায়ী এই স্কিমের সুদের টাকাটি প্রতি তিন মাস অন্তর বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সরাসরি গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হয়ে থাকে।
ত্রৈমাসিক বা কোয়ার্টারলি হিসেব অনুযায়ী দেখতে গেলে এই ৩০ লাখ টাকার এককালীন বিনিয়োগের ওপর প্রতি তিন মাসে সুদের পরিমাণ দাঁড়াবে ঠিক ৬১ হাজার ৫০০ টাকা। নিয়ম অনুসারে প্রতি বছরের এপ্রিল জুলাই অক্টোবর এবং জানুয়ারি মাসের প্রথম দিনে এই সুদের টাকা সরাসরি গ্রাহকদের ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসের সেভিংস অ্যাকাউন্টে চলে আসে। তবে যদি কোনো প্রবীণ নাগরিক ৩০ লাখ টাকার পরিবর্তে এই প্রকল্পে এককালীন ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে চান তবে বার্ষিক ৮.২ শতাংশ সুদের হার অনুযায়ী তিনি প্রতি বছর মোট ২ লাখ ৫ হাজার টাকা সুদ পাবেন। এই ২৫ লাখ টাকার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মাসিক আয়ের অংকটি দাঁড়াবে প্রায় ১৭ হাজার ৮৩ টাকা এবং প্রতি তিন মাস অন্তর তাঁর অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে ৫১ হাজার ২৫০ টাকা।
ভারত সরকারের এই জনপ্রিয় নিয়মে লগ্নি করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট বয়সসীমা এবং নিয়মকানুন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিমে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য নূন্যতম বয়স হতে হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। তবে যদি কোনো চাকুরিজীবী ব্যক্তি ৫৫ বছর থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বয়স থাকাকালীন ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট বা ভিআরএস নেন তবে তিনিও রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট পাওয়ার এক মাসের মধ্যে এই বিশেষ স্কিমে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বা ডিফেন্সে কাজ করা অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা মাত্র ৫০ বছর বয়স হলেই এই আকর্ষণীয় সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পে নিজের নাম নথিভুক্ত করার সুযোগ পেয়ে যান।
বিনিয়োগের পরিমাণের দিক থেকে দেখতে গেলে এই সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিমে অত্যন্ত নমনীয় বা ফ্লেক্সিবল নিয়ম রাখা হয়েছে। এই প্রকল্পে একজন গ্রাহক নূন্যতম ১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো অঙ্কের টাকা জমা করতে পারেন এবং সর্বোচ্চ বিনিয়োগের সীমা ধার্য করা হয়েছে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত। এই সঞ্চয় প্রকল্পের মেয়াদ সাধারণত ৫ বছরের জন্য হয়ে থাকে তবে কোনো গ্রাহক চাইলে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর এই মেয়াদের সময়সীমাকে আরও ৩ বছরের জন্য বাড়িয়ে নিতে পারেন। এর জন্য আমানতকারীকে মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগে পোস্ট অফিসে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট ফর্ম জমা দিয়ে আবেদন জানাতে হয়।
আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি এই স্কিমে বিনিয়োগ করলে কর বা ট্যাক্স ছাড়ের ক্ষেত্রেও এক বিশাল বড় সুবিধা পাওয়া যায়। আয়কর আইনের ৮০সি ধারা অনুযায়ী এই সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিমে বিনিয়োগ করা টাকার ওপর বার্ষিক সর্বোচ্চ ১.৫ লাখ টাকা বা দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ট্যাক্স ছাড়ের দাবি করতে পারবেন গ্রাহকরা। তবে এই প্রকল্পে প্রাপ্ত সুদের পরিমাণ যদি কোনো অর্থবর্ষে ৫০ হাজার টাকার গণ্ডি পার করে যায় তবে সেই উপার্জিত সুদের ওপর টিডিএস কাটা হতে পারে। ফর্ম ১৫জি বা ১৫এইচ জমা দিয়ে এই টিডিএস কাটার হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব তাই অবসর জীবনের দিনগুলি নিশ্চিন্তে কাটাতে এই শূন্য ঝুঁকির সরকারি প্রকল্প বর্তমান দিনে প্রবীণদের সেরা পছন্দ হয়ে উঠেছে।