
দিলীপ ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে নন্দীগ্রাম আসনের জন্য হলদিয়া মহকুমাশাসকের দফতরে মনোনয়ন জমা দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ভোটের দিন যত কাছে আসছে, নন্দীগ্রামে ততই তার প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ছে। এমন দাবিই করছেন নন্দীগ্রামের বিদায়ি বিধায়ক তথা বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি শুভেন্দুর দাবি, এবার নন্দীগ্রামে তৃণমূলের পবিত্র কর তৃতীয় স্থানে শেষ করবেন। শুভেন্দুর বক্তব্য, নন্দীগ্রামে দ্বিতীয় হওয়ার লড়াইয়ে তৃণমূলকে টেক্কা দেবে নওশাদ সিদ্দিকি-র আইএসএফ। নন্দীগ্রামে সংখ্যালঘু ভোট যে একটা ফ্যাক্টর তা শুভেন্দুর একাধিক বক্তব্যে স্পষ্ট।
২০২১ যা বলেছিলেন শুভেন্দু
গত বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর লড়াই দেখেছিল নন্দীগ্রাম। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছিলেন, ‘সংখ্যালঘু’ ভোট ব্যাঙ্কের ভরসায় নন্দীগ্রামে জিততে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তিনি সেই ভোট ব্যাঙ্কেও ভাগ বসাবেন। আর বাকি ভোটের সবটাই যাবে বিজেপিতে। জনসভায় শুভেন্দুর বক্তব্য ছিল, 'মাননীয়া, আপনি কার ভরসায় সেখানে দাঁড়াচ্ছেন? ৬২ হাজারের ভরসায় তো! সেই ভোটেও সিঁধ কাটব। আর পদ্ম বাকি ২ লক্ষ ১৩ হাজার ভোট পাবেই। ২ লক্ষ ১৩ হাজার কারা? জয় শ্রীরাম বলেন যাঁরা।’ ২০২১ সালে সংশোধিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী নন্দীগ্রাম বিধানসভার ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৭৫ হাজার। তার মধ্যে প্রায় ৬২ হাজার ছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেদিন সেই ভাগাভাগিই বোঝাতে চেয়েছিলেন শুভেন্দু।
শুভেন্দু ও সংখ্যালঘু ভোট
এবারও সংখ্যালঘুদের প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করতে দেখা গেছে শুভেন্দু অধিকারীকে। তিনি বলছেন, 'মুসলমানদের ভোট চাই না বলিনি কখনও। বলেছি মুসলিমদের ভোট পাইনি। হিন্দুদের দেওয়া ব্যাপক ভোটই আমাকে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারাতে সাহায্য করেছে।'
ষষ্ঠমুখী লড়াই নন্দীগ্রামে
২০২১ সালে নন্দীগ্রামে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৯৫৬ ভোটে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। এবার তাঁর বিরোধী প্রার্থীদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ বিরোধী দলনেতা। আবার তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর হিসেব দিয়ে বোঝাচ্ছেন, শুভেন্দুকে ৩০ হাজার ভোটে হারাবেন। এই তরজার মধ্যে নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক চিত্রটা বেশ জটিল। এবার নন্দীগ্রামে ষষ্ঠমুখী লড়াই হচ্ছে। বিজেপি, তৃণমূল, ISF-এর পাশাপাশি এবার নন্দীগ্রামে বামফ্রন্ট সমর্থিত সিপিআই, হুমায়ুন কবীরের জেইউপি, কংগ্রেস প্রার্থীরাও থাকছেন। নন্দীগ্রামে সিপিআইয়ের হয়ে দাঁড়িয়েছেন শান্তি গিরি। এই কেন্দ্রে বামেদের সঙ্গে জোট হয়নি নওশাদ সিদ্দিকীর দলের। ২০১১-র আগে নন্দীগ্রামে সিপিআইয়ের বিধায়ক ছিল। দশ বছর পর নন্দীগ্রামে ফের সিপিআইয়ের প্রার্থী থাকছে। এর বাইরে তমলুক লোকসভার এই হাইপ্রোফাইল বিধানসভা আসনে আলাদা করে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে হুমায়ুন কবীরের পার্টিও। জনতা উন্নয়ন পার্টির হয়ে নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়েছেন শাহিদুল হকও। কংগ্রেসও নন্দীগ্রামে প্রার্থী দিয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোট নন্দীগ্রামে ফ্যাক্টর
নন্দীগ্রাম বিধানসভায় দুটি ব্লক। নন্দীগ্রাম ১ ও নন্দীগ্রাম ২। নন্দীগ্রাম ১ ব্লক সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা। আর নন্দীগ্রাম দুই ব্লক হিন্দু প্রভাবিত এলাকা। রয়েছে ১৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত। দুটি পঞ্চায়েত সমিতি ও পাঁচটি জেলা পরিষদ আসন। বিজেপির আশা, নন্দীগ্রামে এবার তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটব্য়াঙ্কে ব্যাপক ধস নামাবে আইএসএফ ও হুমায়ুন কবীরের দল। গত বিধানসভায় শুভেন্দু প্রায় দেড় হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন মমতাকে। ২০২৪ লোকসভায় নন্দীগ্রাম থেকে বিজেপির লিড বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৭ হাজারের কাছাকাছি। গত বিধানসভায় নন্দীগ্রামে মমতা-শুভেন্দু দ্বৈরথে সিপিএম প্রার্থী হয়ে লড়ে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় মাত্র ২.৭৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জামানত জব্দ হয়েছিল। একুশের নির্বাচনের পর শুভেন্দু বলেছিলেন, হিন্দুরা তাঁকে জিতিয়েছেন। এবার রাষ্ট্রবাদী মুসলিমদের কাছেও তাঁকে ভোট দেওয়ার আবেদন জানাচ্ছেন শুভেন্দু। নিজের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। নন্দীগ্রামের ফল নিয়ে শুভেন্দু বলছেন, এই আসনে তৃণমূল দ্বিতীয় কিংবা তৃণমূল হওয়ার জন্য লড়ছে। আইএসএফ একাধিক বুথে তৃণমূলের থেকে বেশি ভোট পাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর কিছুদিন আগেও বিজেপিতে ছিলেন। তৃণমূল প্রার্থী হয়েই অঙ্ক কষে তাঁর দাবি, এবার তৃণমূল নন্দীগ্রামে ৩০ হাজার ভোটে জিতবে।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
SIR-এর পর নন্দীগ্রামে বহু সংখ্যালঘুর ভোট-ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ২০২১ সালে শুভেন্দু এই কেন্দ্রে ভোট পান ১,১০.৭৬৪ টি। শতাংশের হিসেবে ৪৮.৪৯ শতাংশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ১,০৮,৮০৮ টি ভোট। শতাংশের হিসেবে ৪৭.৬৪ শতাংশ। তৃণমূলের ভোটে কমেছিল ১৯.৫৬ শতাংশ। গতবার সংখ্যালঘু ভোট পাননি শুভেন্দু। সেকথা নিজেই জানিয়েছিলেন তিনি। এবারও সংখ্যালঘু ভোট না পেলেও হিন্দু ভোটে পুরোটা গেরুয়া শিবিরের দিকে গেলে শুভেন্দুর জয়ের সম্ভাবনা স্পষ্ট। তবে শুধুমাত্র সংখ্যালঘু ভোট দিয়ে তৃণমূলের পক্ষে নন্দীগ্রাম দখল করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে জিততে হিন্দু ভোট জরুরি। এদিকে ময়দানে ISF-এর পাশাপাশি হুমায়ুন কবীরের জেইউপির উপস্থিতি এবার তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।