
কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের একটি মন্তব্য। আর তাতেই বড় বিতর্ক দানা বেঁধেছে রাজ্য রাজনীতিতে। যে বিতর্কের আঁচ লেগেছে খোদ মমতার কেন্দ্রে। তৃণমূল কাউন্সিলর অসীম বসুর মারফত বার্তা পাঠাতে হয়েছে খোদ দলনেত্রীকে। অথচ আপাতভাবে দেখলে গেলে মহুয়ার মন্তব্যটি দলীয় লাইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণই ছিল। বাঙালি অস্মিতার কথাই তো বলেছেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ! তা-ও কেন তাঁর মন্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে ক্ষমা চাইলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভা ভোটে 'ক্ল্যাশ অব টাইটান্স' ভবানীপুরে। এই কেন্দ্রে একটা বড় অংশের ভোটার অবাঙালি। পরিসংখ্যান বলছে ৪০%। এর মধ্যে রয়েছে শিখ, গুজরাতি ও মারোয়াড়ি। সহজ পাটিগণিত বলছে, ভবানীপুরে অবাঙালি ভোট ফ্যাক্টর। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই ভোটের ফল ঘুরে যাবে। ফলে তৃণমূল গোটা রাজ্যে যে বাঙালি বনাম বহিরাগত ধুয়ো তুলেছে, তা এখানে ব্যুমেরাং হতে পারে।
মহুয়া ঠিক কী বলেছেন?
তৃণমূলের সাংবাদিক বৈঠকে অমিত শাহকে বিঁধতে গিয়ে কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ বলেছিলেন,'বাঙালিরা গর্বিত জাতি। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই করেছিলেন। সেই সময় গুজরাতিরা কোথায়? কালাপানির শাস্তি পাওয়া বিপ্লবীদের ৬০ শতাংশই বাঙালি। বাকিরা পঞ্জাবি। একজন গুজরাতির নামও বলতে পারবেন?'
শুভেন্দুর হাতিয়ার
এই মন্তব্যকে হাতিয়ার করে মহুয়ার গ্রেফতারি দাবি করেন ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর কথায়,'সংবিধানবিরোধী মন্তব্য করেছেন। ওঁকে গ্রেফতার করা হোক। ভবানীপুরে ২৫ হাজার গুজরাতি থাকেন। ২৯ এপ্রিল তাঁরা উচিত সবক শেখাবেন'।
মমতার ক্ষমা-বার্তা
৭০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অসীম বসুকে হোয়াটসঅ্যাপ করে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন তৃণমূল নেত্রী। মমতার সেই বার্তা পাঠ করে অসীম ফেসবুকে জানান, 'আমার সব গুজরাতি ভাই ও বোনেদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আপনাদের জন্য আমি গর্বিত। আপনারা আশ্বস্ত থাকুন, এই ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে। ওই দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইছি'। তারপর ওই ওয়ার্ডে গুজরাতিতে তৃণমূলের দেওয়াল লিখন হয় বলেও খবর।
কেন ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরই মমতার বার্তা পাঠ করলেন?
প্রণিধানযোগ্য, এই ৭০ ওয়ার্ডের গুজরাতিদের বাস। ২০১৫ সালে কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল বিজেপি। ২০২১ সালের পুরভোটে এই ওয়ার্ডটি পুনরুদ্ধার করে তৃণমূল। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে ওয়ার্ডভিত্তিক ফল তৃণমূলের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ, এই ওয়ার্ডে ৩,৮৬৫ ভোটে এগিয়ে গেরুয়া শিবির।
কাঁটায়-কাঁটায় ভবানীপুর
গতবার নন্দীগ্রামে মাত্র ১৯৫৬ ভোটে হেরেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে কথা বারবার নানা সভা-সমাবেশে মনে করিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এতবারই বলেছেন যে এই প্রতিবেদককেও গুগল করে সংখ্যাটা যাাচাই করতে হয়নি। সেখানে ৭০ নম্বর ওয়ার্ডেই বিজেপি এগিয়ে ৪ হাজারের কাছাকাছি ভোটে। ফলে, ভবানীপুরে বাঙালি অস্মিতায় খানিকটা লাগাম দিয়ে পাটিগণিতের হিসেব মেলানোর চেষ্টা করলেন নেত্রী। সেটা কতটা সফল হবে, তা বোঝা যাবে ভোটগণনায়।