
বাংলার রাজনৈতিক আড্ডায় একটা সময় প্রফুল্লচন্দ্র সেনের নাম উচ্চারিত হলেই হাসির রোল উঠত। ছড়া, কৌতুক, ঠাট্টা, সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি। খাদ্য সঙ্কটের সময়, পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে কাঁচকলা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সস্তা বলে। সেই নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস একটু দূর থেকে তাকালে দেখা যায়, এই মানুষটি কেবল রসিকতার চরিত্র নন, তিনি ছিলেন এক কঠোর, নীতিনিষ্ঠ এবং ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মুখ্যমন্ত্রী।
মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ 'আরামবাগের গান্ধী'
১৮৯৭ সালে অবিভক্ত বাংলার খুলনায় জন্ম। ছাত্রজীবনেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া, জেল খাটা, এসব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম অধ্যায়। স্বাধীনতার আগে থেকেই কংগ্রেস সংগঠনে তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়। গ্রামবাংলায় ঘুরে ঘুরে সংগঠন গড়া, কর্মীদের শৃঙ্খলায় বাঁধা, এই ছিল তাঁর শক্তি। দুর্গম এবং ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত হুগলির আরামবাগকেই নিজের কর্মকেন্দ্র বেছে নিয়ে দীর্ঘ ৬০ বছর সেখানেই কাটান। কালক্রমে তিনি 'আরামবাগের গান্ধী' নামে পরিচিত হন। কাঁথি ও তমলুকে 'লবণ আইন' অমান্য আন্দোলনে, ১৯৪০ সালে 'সত্যাগ্রহ আন্দোলনে' ও ১৯৪২ সালে 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে কারাদণ্ড ভোগ করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভায় খাদ্য সরবরাহ দফতরের মন্ত্রী হন। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর পর ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সালে পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। সেই কঠিন সময়। দেশজুড়ে খাদ্যসঙ্কট, আমদানি নির্ভরতা, মূল্যবৃদ্ধি, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। বাংলায় চালের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে, রেশন দোকানে ভিড় বাড়ছে, আর বিরোধীরা সুযোগ খুঁজছে। ১৯৬৭ সালে আরামবাগে তিনি অজয় মুখোপাধ্যায়ের কাছে হেরে যান। তবে ১৯৭১ সালে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন । কংগ্রেস দ্বিধাবিভক্ত হলে তিনি কংগ্রেসে থেকে যান। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হলে তিনি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এক সময় জনতা পার্টিতে যোগ দিয়ে দলের রাজ্য কমিটির সভাপতি হন। ১৯৭৭ সালে ওই দলের প্রার্থী হিসেবে লোকসভার সদস্যও হন।
সাদা খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি, মিতভাষী ও বিতর্ক
স্বাধীনতার পর তিনি খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। সাদা খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি, মিতভাষী স্বভাব, অনাড়ম্বর জীবন, সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন একেবারে গান্ধীবাদী চরিত্র। প্রশাসনে কড়াকড়ি ছিল, আপসের জায়গা কম। অনেকেই বলতেন, 'প্রফুল্লবাবু নিয়ম মানেন, আর নিয়ম মানাতেও জানেন।' ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন তাঁর শাসনকে নাড়িয়ে দেয় ভিত থেকে। রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ, ধর্মঘট, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত। জনতার ক্ষোভ ক্রমশ ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়। তখনই জন্ম নেয় নানা রসিকতা। বলা হত, তিনি নাকি মানুষকে “কম খেতে” বলেছেন, বিকল্প খাদ্য খুঁজতে বলেছেন। ইতিহাসবিদেরা বলবেন, কথাগুলির অনেকটাই অতিরঞ্জিত, কিন্তু রাজনীতিতে ধারণাই বাস্তব। বিরোধীরা এই কথাগুলিকে অস্ত্র বানায়। দেওয়ালে দেওয়ালে ছড়া, মিছিলে মিছিলে ব্যঙ্গ, প্রফুল্ল সেন হয়ে ওঠেন এক রাজনৈতিক প্রতীকে।
তবে এই ব্যঙ্গের আড়ালে ছিল এক কঠিন বাস্তবতা। খাদ্যসঙ্কট ছিল সর্বভারতীয় সমস্যা। কেন্দ্রীয় নীতির সীমাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি, সব মিলিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল। প্রফুল্ল সেন প্রশাসনিকভাবে রেশনিং কড়াকড়ি করেন, মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। কিন্তু জনরোষের ঢেউ তখন এতটাই তীব্র যে প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট মনে হয়নি। তাঁর শাসনকালে কৃষি ও সমবায় ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। গ্রামীণ উৎপাদন বাড়ানো, স্বনির্ভরতার ধারণা জোরদার করা, এসব ছিল তাঁর নীতির অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংযম ও শৃঙ্খলাই অর্থনৈতিক সঙ্কটের মোকাবিলার পথ। কিন্তু ষাটের দশকের উত্তাল রাজনীতিতে এই বার্তা জনমনে সাড়া জাগাতে পারেনি।
ব্যক্তিগত সততা নিয়ে বিরোধীরাও প্রশ্ন তোলেননি
১৯৬৭ সালের নির্বাচন বাংলার রাজনীতিতে পালাবদলের সূচনা করে। কংগ্রেস পরাজিত হয়, যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। দীর্ঘদিনের কংগ্রেস শাসনের ইতি ঘটে। প্রফুল্ল সেন এই পরাজয়ের পর ধীরে ধীরে রাজনীতির প্রান্তে সরে যান। ক্ষমতার চেয়ারে আঁকড়ে থাকার মানুষ তিনি ছিলেন না। তাঁর ব্যক্তিগত সততা নিয়ে বিরোধীরাও প্রশ্ন তোলেননি। আজ যখন তাঁর নাম ওঠে, খাদ্য আন্দোলনের গল্প আগে আসে, তারপর তাঁর প্রশাসনিক অবদান। কিন্তু ইতিহাসের বিচার একটু গভীর। তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি কঠিন সময়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং জনপ্রিয়তার চেয়ে নীতিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তাঁর কঠোরতা তাঁকে ব্যঙ্গের লক্ষ্য করেছে, আবার সেই কঠোরতাই তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।
সোমনাথকে হারিয়ে প্রফুল্ল সেনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন মমতা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৮৪ সালে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে পর দেখা করতে গিয়েছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র সেনের সঙ্গে। সকলে জেনেছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী সেই অশীতিপর বৃদ্ধ ঠিক কী ভাবে তাঁর জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন। সহজ সরল অনাড়ম্ভর গান্ধীবাদী এক নেতা ছিলেন প্রফুল্ল সেন। শেষ বয়সে এমন অবস্থা ছিল, যে চিকিত্সার সমস্ত খরচও তাঁর নিজের পক্ষে বহন করাও কঠিন হয়ে গিয়েছিল।