
রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্কে ভবানীপুরকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বিজেপি। লক্ষ্য একটাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের কেন্দ্রেই ব্যস্ত ও চাপে রাখা। দলের অন্দরমহলের বক্তব্য, রাজ্যজুড়ে প্রচারের বদলে যদি তৃণমূল নেত্রীকে ভবানীপুরে বেশি সময় দিতে বাধ্য করা যায়, তা হলে তা বিজেপির কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হবে।
এই পরিকল্পনার সূচনা অন্তত ৬ মাস আগে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে ভবানীপুর কেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই সেখানে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে শুরু করে বিজেপি। শহরের হৃদয়ে অবস্থিত এই কেন্দ্রে বিজেপি এখনও পর্যন্ত কোনও বিধানসভা আসন জিততে পারেনি। তবু ধারাবাহিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে জমি শক্ত করার চেষ্টা চলছে।
দোলের দিনেও, যখন অধিকাংশ নেতা নিজেদের এলাকায় উৎসবে ব্যস্ত, তখন শুভেন্দু নন্দীগ্রাম ছেড়ে ভবানীপুরে শোভাযাত্রা করেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে হারানো এই নেতা ভবানীপুরে কীর্তন গেয়ে ‘হিন্দু ঐক্য’র বার্তা দেন। বিজেপির একটি সূত্রের দাবি, শেষ মুহূর্তে বড় কোনও পরিবর্তন না হলে শুভেন্দুকেই ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী করা হতে পারে।
বিজেপির কৌশল মূলত দু’টি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে। প্রথমত, নির্বাচনী প্রচারের সময় মমতাকে ভবানীপুরেই ব্যস্ত রাখা, যাতে রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তে তাঁর উপস্থিতি কমে। দ্বিতীয়ত, একটি জোরালো বার্তা তৈরি করা, মুখ্যমন্ত্রী নিজের কেন্দ্রেও ‘নিরাপদ’ নন। দলের মতে, এতে তৃণমূল কর্মীদের মনোবলে প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে ভোটার তালিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভবানীপুরে প্রায় ৪৭ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ, আরও প্রায় ১৪ হাজারের বেশি নাম ‘বিচারাধীন’ অবস্থায় রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ১,৫৯,২০১। বিজেপি এই তথ্যকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরছে।
অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এবং সেই কারণেই একাধিকবার ভবানীপুরে সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কলকাতা দক্ষিণ কেন্দ্রে তৃণমূলের লিড উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়লেও দল বলছে, উপনির্বাচনের ফল নয়, তারা ২০২১ সালের মূল বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলকেই ভিত্তি করছে।
মমতা নিজেও প্রকাশ্যে আত্মবিশ্বাসী সুরে বলেছেন, 'আমার ভবানীপুর ছোট কেন্দ্র। তবু যদি মাত্র একজন ভোটারও থাকে, আমি সেখান থেকেই জিতব।' তাঁর অভিযোগ, বিজেপি পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবানীপুরকে কেন্দ্র করে বিজেপি যে চাপের রাজনীতি করছে, তা মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শহুরে ভোটের ধারা বড় আকারে পরিবর্তিত না হলে ফল ঘুরিয়ে দেওয়া কঠিন।
সব মিলিয়ে, ‘দিদির মাঠ’ ভবানীপুর এখন রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। নজর একদিকে শুভেন্দুর, অন্যদিকে মমতার আত্মবিশ্বাস, শেষ হাসি কে হাসবে, তা বলবে ভোটের ফল।