
তিনি ভবানীপুরের 'চাণক্য'। ছাব্বিশের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫ হাজারের বেশি ভোট মার্জিনে হারানো শুভেন্দু অধিকারীর জয়ের পিছনে রয়েছে তাঁর বিরাট অবদান। বাংলার কোনও ভূমিপুত্র নয়, তিনি রাজস্থান থেকে আসা প্রাক্তন বিধায়ক। নাম রাজেন্দ্র সিং রাঠোর। ভবানীপুরে বিপুল ভোটে জিতে শুভেন্দু যে আট জনকে ধন্যবাদ জানান তাঁদের মধ্যে একজন হলেন এই রাজেন্দ্র রাঠোর। কে তিনি? কোন চালে বাংলার মাটিতে বসে এই আসনে বিজেপিকে জেতালেন? জেনে নিন বিস্তারিত।
ভবানীপুর মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র। ২০১১ সাল থেকে উপ-নির্বাচন হোক বা বিধানসভা নির্বাচন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই জিতেছেন। ১৯৫১ সালে গঠিত হয় এই বিধানসভা কেন্দ্র। তারপর থেকে উপ-নির্বাচন সহ ১২টি ভোট দেখেছে ভবানীপুর। ২০১১ ও ২০২১, দু'টি উপনির্বাচনেই মমতাকে বিধানসভা পাঠিয়েছে এই কেন্দ্র। ১৯৫২, ১৯৫৭ ও ১৯৬২ সালের পরে ভবানীপুর কেন্দ্রের নাম বদলে করা হয়েছিল কালীঘাট। ১৯৬৭ ও ১৯৭২ সালে কালীঘাট কেন্দ্র হিসেবেই ভোট হয়েছিল। ১৯৭৭ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত এই কেন্দ্রটির অস্তিত্ব ছিল না। পরে ২০০৯ সালে আবার গঠিত হয়। ২০০৯-এর লোকসভা ভোট ও ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে ছিল ভবানীপুর কেন্দ্র।
ভবানীপুরের 'চাণক্য' রাজেন্দ্র রাঠোর
শুভেন্দুকে মমতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানোয় এই কেন্দ্রটি ২০২৬ সালে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজ্য রাজনীতিতে হাইভোল্টেজ লড়াই হয় এই কেন্দ্রে। শুভেন্দু বারংবার দাবি করেন এই আসনে মমতাকে হারিয়ে তিনিই জয়ী হয়ে আসছেন। তাঁর আত্মবিশ্বাসকে অনেকেই আমল দিতে রাজি হননি তখন। ভোটের ফলপ্রকাশ হতেই মিলে যায় শুভেন্দুর দাবি করা সব কথা। এর পিছনে বড় হাত ছিল এই রাজস্থানি বিজেপি নেতা রাজেন্দ্র রাঠোরের কষা অঙ্ক। ভবানীপুরে জয়ী হয়েই শুভেন্দু রাজেন্দ্রর নাম করে তাঁকে ধন্যবাদ জানান। বলেন, "আমি রাজস্থানের আট বিধায়ক, রাজেন্দ্র রাঠোরের নেতৃত্বে ওরা অনেক কাজ করেছেন আমার জন্য, তাঁদের প্রণাম জানাই।" তার পর থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিল কে এই রাজেন্দ্র রাঠোর? বলা হয় তিনি ভবানীপুরের 'চাণক্য'।
ভবানীপুরের কোন আসনে কত হিন্দু, সংখ্যালঘু, তফসিলি ভোটার সমস্ত তথ্য জোগাড় করা থেকে ভোটারদের মন ঘুরিয়ে বিজেপির দিকে আকর্ষণ করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। ভবানীপুরের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিনিধি পাঠানো থেকে গুজরাতি, মারওয়াড়ি সহ হিন্দু ভোটারদের সঙ্গে পৃথকভাবে জনসংযোগ স্থাপন করান তিনি। অবর্জাভারের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। ভোটারদের মধ্যে যে ভয় কাজ করছিল তা দূর করা, কাটমানি, চরম গুন্ডারাজ নিয়ে ওলিগলিতে গিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ভবানীপুরকে ভয়মুক্ত করতে প্রচার চালান তাঁরা। মাইক্রো লেবেলে গিয়ে সব বুথে সমীক্ষা চালানো হয়। তারই ফলস্বরূপ বিজেপির হাতে আসে হটসিট ভবানীপুর।
কে এই রাজেন্দ্র রাঠোর?
বিজেপির সদস্য হিসেবে তিনি রাজস্থান বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি চুরু এবং তারানগর থেকে রাজস্থান বিধানসভার সাতবারের প্রাক্তন সদস্য। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP) থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। চুরু এবং তারানগরের মতো নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করে রাজস্থান বিধানসভায় সাতবার নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর কর্মজীবনে, তিনি ভৈরন সিং শেখাওয়াত এবং বসুন্ধরা রাজের নেতৃত্বাধীন রাজস্থান সরকারে মন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদীয় বিষয়, গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বাস্থ্য এবং পঞ্চায়েতি রাজ সহ বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০২৩ সালে, তিনি রাজস্থান বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতার পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর ভবানীপুরে বিজেপিকে জেতানোর সমস্ত দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তাঁর কাঁধে। কলকাতায় থেকে ভবানীপুরকে জেতানোর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন এই রাজস্থানের বিজেপি নেতা রাজেন্দ্র রাঠোর।