মে মাসের চড়া রোদে যখন পুড়ছে গোটা দেশ, ঠিক তখনই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সাক্ষী থাকল হিমাচল প্রদেশ। দেশের সমতলে যখন সূর্যদেব অগ্নিবর্ষণ করছেন, তখন হিমাচলের পাহাড়ি ও উঁচু এলাকাগুলিতে তুষারপাতের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে ভিড় জমিয়েছেন হাজার হাজার পর্যটক। তীব্র গরম থেকে বাঁচতে এবং গরমের ছুটিতে বরফ ছোঁয়ার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে আট থেকে আশি, সবাই এখন হিমাচলের পাহাড়ে। আর এই সুযোগে সোশ্যাল মিডিয়াতেও রোহতাং ও শিঙ্কুলা পাসের সেই মনমুগ্ধকর বরফে ঢাকা ভিডিওগুলি ঝড়ের গতিতে ভাইরাল হতে শুরু করেছে।
হিমাচলের মৈনাক ও মধ্য পার্বত্য অঞ্চলগুলিতেও কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে গরমের তেজ কম ছিল না। এমনকি উনা জেলার তাপমাত্রা একধাক্কায় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে গিয়েছিল। সমতলের এই অসহ্য ও হাঁসফাঁস গরম থেকে সাময়িক রেহাই পেতেই লাখ লাখ মানুষ তড়িঘড়ি ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে মানালি এবং তার আশেপাশের চিরতুষারে ঢাকা পাহাড়ি এলাকাগুলির দিকে রওনা দেন। গরমের মরশুমে আচমকা রোহতাং পাসে টাটকা তুষারপাত শুরু হতেই যেন মেঘ না চাইতেই জল পাওয়ার মতো অবস্থা হয় ভ্রমণপিপাসুদের। তুষারপাতের খবর চাউর হতেই পর্যটকদের উৎসাহ ও উন্মাদনা একলাফে বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।
তবে এই ব্যাপক পর্যটকের ঢল নামার জেরে পাহাড়ি রাস্তায় তৈরি হয়েছে এক চরম বিপর্যয়। রোহতাং পাস এবং শিঙ্কুলা পাসের রাস্তায় হঠাৎ করে রেকর্ড সংখ্যক গাড়ি ঢুকে পড়ায় মাইলের পর মাইল জুড়ে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যাম। হিমালয়ের দুর্গম সর্পিল রাস্তায় শুধুই সারি সারি কার, ট্যুরিস্ট ট্যাক্সি এবং বাইকের অন্তহীন লম্বা লাইন চোখে পড়ছে। ট্রাফিকের এই অবর্ণনীয় চাপের কারণে পর্যটকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামের মধ্যে আটকে থাকতে হয়। বহু মানুষ শুধুমাত্র একদিনের ট্যুর বা ডে-ট্রিপের পরিকল্পনা করে সকাল সকাল বরফ দেখার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও মাঝরাস্তাতেই আটকে পড়েন।
আসল কথা হলো, সম্প্রতি সাধারণ পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে বিখ্যাত রোহতাং পাস। এর পাশাপাশি লাদাখ সীমান্তের সংযোগকারী শিঙ্কুলা পাসেও এই মুহূর্তে ভালো পরিমাণে বরফ মজুত রয়েছে। ফলে এই দুই বরফ-রাজ্যকে চাক্ষুষ করতে ভোররাত থেকেই গাড়ির চাকা ঘুরতে শুরু করেছিল। বরফের রাজ্যে পৌঁছে বহু পর্যটককে মনের আনন্দে বরফ নিয়ে খেলতে, সেলফি তুলতে কিংবা রিলস ও ভিডিও বানাতে দেখা যায়। তবে পাহাড়ের আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় হঠাৎই পরিস্থিতি বিগড়ে যায় এবং আচমকা আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় কিছু অতিউৎসাহী পর্যটক তীব্র বরফ ঝড়ের (Blizzard) মুখে পড়ে ফেঁসে যান।
ভারী তুষারপাতের জেরে বেশ কিছু জায়গায় রাস্তা চরম বিপজ্জনক ও পিছল হয়ে পড়ে। ফলে চাকা স্কিড করার ভয়ে পর্যটকদের গাড়ি ও ট্যাক্সিগুলি অত্যন্ত ধীর গতিতে চলতে বাধ্য হয়। তুষারঝড়ের দাপটে বেশ কিছু গাড়ি মাঝরাস্তাতেই দীর্ঘক্ষণ আটকে পড়ে। এমন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পাহাড়ি ট্রাফিক ও বিপর্যয় সামাল দিতে হিমাচল প্রদেশের স্থানীয় প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশকে কার্যত কালঘাম ফেলতে হচ্ছে। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধার করতে হিমাচল পুলিশকে ব্যাপক কসরত ও কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
তবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও খুশির হাওয়া হিমাচলের স্থানীয় পাহাড়ি ব্যবসায়ী মহলে। মে মাসের এই মরশুমে পর্যটকদের অভাবনীয় ভিড়ের কারণে হোটেল ব্যবসায়ী, হোমস্টে মালিক, ট্যাক্সি চালক থেকে শুরু করে প্যারাগ্লাইডিং ও অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের সঙ্গে যুক্ত ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাপক আর্থিক লাভের মুখ দেখছেন। হিমাচলের হোটেল বুকিং থেকে শুরু করে লোকাল যাতায়াতের গাড়ির চাহিদা এই মুহূর্তে আকাশছোঁয়া। মে মাসের শেষ লগ্নে এসেও ডুয়ার্স বা অন্যান্য পাহাড়ের তুলনায় হিমাচলের এই উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলগুলিতে এত ভালো পরিমাণে বরফ মেলায় মুখে চওড়া হাসি পর্যটন ব্যবসায়ীদের।
এদিকে আবহাওয়া দফতরের (IMD) পূর্বাভাস অনুযায়ী, হিমাচলের এই উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলগুলিতে আগামী কয়েকদিন ধরে দফায় দফায় বৃষ্টি এবং হালকা থেকে মাঝারি তুষারপাত জারি থাকতে পারে। তবে এই মেঘ-বৃষ্টির যুগলবন্দির জেরে হিমাচলের তাপমাত্রা একধাক্কায় অনেকটাই নিচে নেমে গিয়েছে। পাহাড়ি শহর মানালির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এই মুহূর্তে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি, যা আগের তুলনায় বেশ অনেকটাই কম। মানালি ছাড়াও কুল্লু, লাহাউল-স্পীতি, কিন্নর এবং তার সংলগ্ন পাহাড়ি জনপদগুলিতে এক মনোরম কনকনে ঠান্ডার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
হিমাচলের আবহাওয়ার এই দ্রুত ভোলবদল ও প্রাকৃতিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে জেলা প্রশাসনের তরফে পর্যটকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের আবহাওয়া অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তাই উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণের সময় বিশেষ সতর্কতা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসন সাফ জানিয়েছে, পর্যটকেরা যেন পাহাড়ি রাস্তায় সাবধানে গাড়ি চালান এবং রওনা দেওয়ার আগে অবশ্যই আবহাওয়ার লাইভ আপডেট বা সর্বশেষ পরিস্থিতি ভালো করে খতিয়ে দেখে নেন।