বেশ কয়েক দশক পরে ২০২৬ সালে শহরে ইদের নমাজ সরল রেড রোড থেকে। তার বদলে ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে পাঠ হল বকরি ইদের নমাজ।
ছবি: অর্ঘ্য ঘোষ
বকরি ইদের আগে কার্যত ফাঁকাই থাকল উত্তরের বিভিন্ন গরু বিক্রির হাট। বুধবার কেউ কেউ অবশ্য গরু নিয়ে হাজির হয়েছিলেন হাটে। দিনভর বসে থেকেও অনেকের খদ্দের মেলেনি।
ছবি: অর্ঘ্য ঘোষ
এ বছর ইদের নমাজ রেড রোডে অনুষ্ঠিত হবে না বলে আগেই জানা গিয়েছিল। আর তার বিকল্প হিসেবেই ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড এল সামনে। এখানেই পড়া হল ইদের নমাজ। সেখানেই সকাল সকাল হাজির হন প্রচুর সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।
ছবি: অর্ঘ্য ঘোষ
১৯৭৮ সালের পর এই প্রথম রেড রোডের বদলে ব্রিগেডে নমাজ অনুষ্ঠিত হল। ধর্মের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। ঐতিহাসিক এই গ্রাউন্ড একটা সময়ে রাজনৈতিক সমাবেশের পীঠস্থান ছিল। তবে ইদানিং সেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরও আয়োজন হচ্ছে। মাত্র কিছুদিন আগেই ব্রিগেড সাক্ষী ছিল 'লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠ' অনুষ্ঠানের।
ছবি: অর্ঘ্য ঘোষ
রেড রোড চত্বরে বরাবরই পাঠ হয় ইদের নমাজ। তৃণমূল জমানায় এই ধর্মীয় সমাবেশ রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছিল, কারণ একাধিকবার খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা গিয়েছে ইদের নমাজে। মাথায় কাপড় দিয়ে প্রতি বছর ইদের সকালে রেড রোডের মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি চর্চার বিষয়বস্তু ছিল। তবে রাজ্যের আরও দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে অবশ্য কখনও ইদের নমাজের মঞ্চে দেখা যায়নি।
কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত রাস্তার নাম রেড রোড। প্রতি মুহূর্তে এই রাস্তা দিয়ে প্রচুর গাড়ি যায়। এই রাস্তার দুই ধারে রয়েছে একাধিক ফুটবল ক্লাবের অফিস এবং পূর্ব ভারতের সেনার সদর দফতর। এছাড়া এই রোড দিয়ে বিধানসভা থেকে শুরু করে কলকাতা হাইকোর্ট, রাজভবন যাওয়া যায়। এই রাস্তাটা আবার ধর্মতলাকেও কানেক্ট করে। আর এই রাস্তাতেই বছরের দুই ইদ উদযাপিত হতো।
সেই রেড রোডে এবার আর ইদের নমাজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে গত বছরই রেড রোডে ইদ জামাত নিয়ে আপত্তি তোলা হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে। যেহেতু ওই এলাকা সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত জায়গা, তাই এর পুরো নিয়ন্ত্রণ সেনা দফতরের কাছেই রয়েছে। গত বছরই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে রেড রোডে নমাজ হবে না।
BJP সরকার গঠনের পর কলকাতার রাস্তায় নমাজ পড়া পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে। এমনকী জুম্মাবারেও রাস্তায় নমাজ পড়া যাচ্ছে না। মূলত মসজিদেই পড়তে হচ্ছে।
ইদ উপলক্ষে মসজিদে মসজিদে আয়োজন হয়েছে বিশেষ দোয়ার। ইদের এই পবিত্র দিনে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরকে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা বার্তা জানিয়েছেন।
ইদ-উল-আধহার এই দিনে দারিদ্রের সেবা, সাহায্য করা, ভাতৃত্ববোধ বাড়ানো ইত্যাদি খুব পুণ্যের বিষয় বলে বিবেচিত হয়।
বকরি ইদের দিন প্রত্যেক মুসলিম বাড়িতে বিশেষ খাবার তৈরি হয়। বাড়ি বাড়ি হরেক রকমের মাংসের পদ রান্না করা হয়-যেমন বিরিয়ানি, কোরমা, কাবাব, রেজালা এবং ভুনা। এর সঙ্গে থাকে মিষ্টিমুখ করার জন্য সেমাই, ক্ষীর, পায়েস এবং জর্দা। পরিবারের সদস্যরা নতুন পোশাক পরে নানা স্বাদের মিষ্টি থেকে মাংসের পদ উপভোগ করেন। বাড়িতে বন্ধু , আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করেন। ছোট থেকে বড় সকলকে উপহার দেওয়াই রীতি।
বকরি ইদে গরু কুরবানি কোনও আবশ্যিক ধর্মীয় প্রথা নয় এবং ইসলাম ধর্মে এটি বাধ্যতামূলক নয়। সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছিল এ কথা। ফলে এ বছর অধিকাংশ এলাকাতেই গরুজবাই হয়নি।
গত ১৩ মে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে রাজ্য সরকার জানিয়েছিল যে, ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর এবং মোষকে উপযুক্ত নয় বলে ঘোষণা করা শংসাপত্র ড়া জবাই করা যাবে না।
আরও বলা হয়, শুধুমাত্র অযোগ্য হিসেবে শংসাপ্রাপ্ত পশুই জবাই করা যাবে এবং তাও কেবলমাত্র কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত কসাইখানা বা জবাইখানায়। বেআইনি পশু জবাই রোধে কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন স্থানে পরিদর্শনের ক্ষমতাও দেওয়া হয় ওই বিজ্ঞপ্তিতে।
রাজ্যের সরকার যখন বলে দিয়েছে, প্রকাশ্য প্রাণী জবাই করা যাবে না, তখন বকরি ইদের দিনও তা হবে না। আর এমনটা তো করা উচিতও নয়। অন্য ধর্মের মানুষ পাশে থাকেন, তাঁদের তো অস্বস্তিও হতে পারে। এমনটাই জানিয়েছিল নাখোদা মসজিদ।