সিকিমের পাহাড়ে এখন বসন্তের দেখা নেই। বদলে আকাশ ভেঙে নামছে হাড়কাঁপানো তুষারপাত। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এখন সবুজ নয়, বরং রাজত্ব করছে ধবধবে সাদা বরফের চাদর।
শনিবার রাত থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিল। রাতের অন্ধকার নামতেই শুরু হয় ঝিরঝিরে তুষারপাত, যা ভোরের দিকে কার্যত ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। এর জেরে সিকিমের অন্যতম প্রধান ধমনী জওহরলাল নেহরু (জেএন) রোড এখন পুরোপুরি বরফের তলায়।
প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সমতল থেকে আসা পর্যটকরা। নাথুলা এবং বাবা মন্দির যাওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা সাতসকালে তৈরি হয়েছিলেন, তাতে ইতি টেনেছে প্রশাসন। বরফের পুরু আস্তরণ পথ আটকে দাঁড়িয়েছে যমদূতের মতো।
আবহাওয়ার মতিগতি বুঝে সিকিম পুলিশ কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি। প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা সবার আগে। তাই আপাতত ছাঙ্গু বা সোমগো লেকের ওপরে আর কোনও গাড়িকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এখন শুধু বরফ আর বরফের পাহারা। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, গতকাল রাত থেকে তুষারপাতের দাপট যে হারে বেড়েছে, তাতে রাস্তাঘাট অত্যন্ত পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে। চাকা পিছলে বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই এই কড়া নিষেধাজ্ঞা।
শহর গ্যাংটকের ছবিটা অবশ্য একটু অন্যরকম। সেখানে মাঝেমধ্যে মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের লুকোচুরি দেখা যাচ্ছে। রোদের ঝিলিক দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন দিনটা ভালই কাটবে। কিন্তু ওপরের পাহাড়ের মেজাজ অতটা প্রসন্ন ছিল না।
পূর্ব সিকিমের উঁচু এলাকাগুলিতে এখনও লাগাতার তুষারপাত চলছে। ফলে সেনাকর্মী থেকে শুরু করে বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশনের কর্মীরা তটস্থ। রাস্তা থেকে বরফ সরানোর কাজ শুরু হলেও প্রকৃতির দাপটের কাছে বারবার থমকে যেতে হচ্ছে তাঁদের।
পর্যটকদের অনেকেই পকেটে নাথুলা যাওয়ার পারমিট নিয়ে গ্যাংটক ছেড়েছিলেন। কিন্তু পুলিশের ব্যারিকেড পার হওয়ার উপায় নেই। শেষমেশ ছাঙ্গু লেকের হিমশীতল হাওয়ায় গা ভাসিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাঁদের। নাথুলা যাওয়ার আক্ষেপ এখন পর্যটকদের গলার কাঁটা।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তুষারপাত না থামলে রাস্তা সাফ করা অসম্ভব। আর রাস্তা সাফ না হলে স্বাভাবিক হবে না যানচলাচল। ফলে বুকিং বাতিলের আশঙ্কায় বুক কাঁপছে হোটেল মালিকদেরও।
ছাঙ্গু লেক পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি মিললেও সেখানে পৌঁছনোটাই এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। কনকনে ঠাণ্ডার সাথে পিচ্ছিল রাস্তা, সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর অথচ বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের সাবধান করতে প্রশাসনের তরফে মাইকিং চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এই সময় সাধারণত আবহাওয়ার এমন রুদ্রমূর্তি দেখা যায় না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সিকিমের পাহাড়ে এখন যখন-তখন বরফ নামছে। আর সেই বরফের কামড়ে থমকে যাচ্ছে গোটা সিকিমের পর্যটন ব্যবস্থা।
আপাতত নাথুলা আর বাবা মন্দিরের পথ 'বন্ধ'। পর্যটকদের একমাত্র সান্ত্বনা ছাঙ্গু লেকের তুষারসাদা রূপ। কাল আকাশ পরিষ্কার হবে কি না, সেই উত্তর এখন লুকোনো রয়েছে হিমালয়ের জমাট বাঁধা মেঘের আড়ালে।