ক্রিকেটকে সাধারণভাবে 'বড়োলোকের খেলা' বলে ধরা হলেও, ভারতীয় ক্রিকেটের ক্ষেত্রে চিত্র কিন্তু একেবারে আলাদা। এবারের আইপিএল-এও উঠে এসেছেন একাধিক তারকা। প্রতিবছরই এ দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা ক্রিকেটাররা আইপিএল-এর মতো মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করছেন। সেই তালিকায় বৈভব সূর্যবংশী যেমন আছেন তেমন আছেন মুকুল চৌধুরী বা কাশ্মীরের আকিব নবীরা।
বিহারের সামস্তিপুর জেলার তাজপুর গ্রামের এই কিশোর মাত্র ১৪ বছর বয়সেই টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি করে চমকে দিয়েছিল ক্রিকেটবিশ্বকে। ধারাবাহিকভাবে সেই জায়গা ধরে রেখেছেন বৈভব। জসপ্রীত বুমরার প্রথম বলে ছক্কা মারার পর জস হ্যাজেলউডের প্রথম বলে চার। বৈভবের কাছে মারই একমাত্র জবাব। গিয়ার বদলাতে জানেন না, বোলারের নাম দেখেন না শুধু একটা গোলাকার বল শরীরের দিকে ছুটে এলে ব্যাট চালিয়ে দেন সপাটে। সরল সাধাসিধে মুখের আড়ালে কত আগ্রাসন যে লুকিয়ে তা দেখা যাচ্ছে বারবার। চলতি মরসুমে রাজস্থান রয়্যালস তাকে ১.১ কোটিতে ধরে রাখে।
রাজস্থানের ভরতপুর থেকে উঠে আসা কার্তিক শর্মার গল্প আরও বেশি আবেগঘন। দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তাঁর পরিবার জমি-গয়না পর্যন্ত বিক্রি করেছে। সেই ত্যাগের ফল মিলেছে এবারের আইপিএল নিলামে। চেন্নাই সুপার কিংস তাকে ১৪.২০ কোটিতে দলে নিয়েছে।
দারিদ্র, অনিশ্চয়তা আর লড়াই – এই তিন শব্দের মিশেলেই মধ্যপ্রদেশের তরুণ পেসার মঙ্গেশ যাদবের জীবনকথা। সেই সংগ্রামের গল্পই নতুন মোড় নিয়েছে। আরসিবি তাঁকে ৫.২০ কোটি টাকায় দলে নিয়েছে। বোরগাঁও গ্রামের এক ভাড়াবাড়িতে বেড়ে ওঠা মঙ্গেশের জীবন ছিল সীমিত আয়ের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই। তাঁর বাবা রাম আওধ যাদব পেশায় ট্রাকচালক। ভোর ৩টেয় উঠে দিনভর ঝুঁকিপূর্ণ পথে গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতেন।
কাশ্মীরের বারামুল্লার শিরি গ্রামের ছেলে আকিব নবি। যিনি 'নর্থ কাশ্মীর এক্সপ্রেস' নামে পরিচিত। তাঁর সাফল্য যেন এক সিনেমার গল্প। তাঁর বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। কিন্তু টেলিভিশনে ডেল স্টেনের আগুনঝরা বোলিং দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ফাস্ট বোলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। এবারের আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালস ৮.৪ কোটি টাকায় কিনেছে জম্মু-কাশ্মীরের পেসারকে। এরপর নবির গ্রামে শুরু হয় উৎসব।
ঝাড়খণ্ডের সিলাম পাণ্ডানটোলির আদিবাসী তরুণ রবিন মিনজের গল্পও অনন্য। কাঠের লাঠি আর টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট শিখেছেন তিনি। ২৩ বছরের এই উইকেটরক্ষক ব্যাটারকে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স ৬৫ লক্ষ টাকায় ধরে রেখেছে।
রাজস্থানের অশোক শর্মার উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে তার দাদার আত্মত্যাগ। তাঁর হাত ধরে উমরান মালিক, ময়ঙ্ক যাদবের পর ভারতীয় ক্রিকেটে নয়া গতিদানবের আবির্ভাব হয়েছে। সেই বলের গতি ছিল ১৫৪.২ কিমি। এবার ২৩ বছরের পেসারকে ৯০ লক্ষ টাকায় কিনে নিয়েছে গুজরাত টাইটান্স।
রাজস্থানের ঝুনঝুনু থেকে সঞ্জীব গোয়েঙ্কার দলে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। মুকুল চৌধুরী। দেশের ক্রিকেটভক্তরা এতক্ষণে নাম জেনে গিয়েছে। কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিরুদ্ধে ২৭ বলে ৫৪ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে লখনউ সুপার জায়ান্টসকে ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন। ছোটবেলায় আর্থিক সংকটের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে আইপিএলের মঞ্চ পর্যন্ত এসেছেন। তাঁকে ২.৬০ কোটি টাকায় কিনে নেয় লখনউ সুপার জায়ান্টস।
এবারের আইপিএলে স্বপ্নের অভিষেক হয়েছে তাঁর। দিনমজুরের সন্তান ব্রিজেশ শর্মা সোনালি সফরের শুরু হয়েছে। গতিতে-সুইংয়ে মুগ্ধ করে দিক গোটা ক্রিকেটবিশ্বকে। এখন কেউ তাঁকে বলছে ‘উধমপুর এক্সপ্রেস’, কেউ-বা ‘উধমপুরের শের’। এরকম নামডাক আরও হবে ব্রিজেশের। আইপিএলের নিলামে রাজস্থান রয়্যালস ৩০ লক্ষ টাকা দিয়ে কেনায় দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর পড়ে। সিএসকে'র বিরুদ্ধে সুযোগ পেয়ে তাঁর বোলিং পরিসংখ্যান ৩ ওভারে ১৭ রানে ১ উইকেট।
গত আট বছর ধরে খেলার সুবাদে তিনি কেকেআরের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছেন। নিজেকে প্রমাণ করে এখন তিনি নাইটদের সহ-অধিনায়ক। স্বপ্নের সফরটা নেহাতই সহজ ছিল না রিঙ্কুর। কাঁটায় মোড়া পথ পেরিয়েই সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন। উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে জন্ম তাঁর। একটা সময় সংসার চালাতে ঝাড়ুদারের কাজও করেছেন তিনি। কিন্তু এতেও তাঁর ২২ গজে খেলার স্বপ্নকে ধামাচাপা দেওয়া যায়নি।
মাথার উপর স্থায়ী ছাদ ছিল না। দু’বেলা দু’মুঠো খাবারও জুটতো না রোজ। অর্থের অভাবে একসময় ফুচকাও বিক্রি করতে হয়েছে যশস্বী জয়সওয়ালকে। কিন্তু ইচ্ছাশক্তি দমেনি কখনও। ইচ্ছেডানায় ভর করেই স্বপ্নের উড়ান ভরেছিল। আইপিএলে তিনি খেলেন রাজস্থান রয়্যালসে। তাঁকে ১৮ কোটি টাকায় রিটেন করেছে তারা।