সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা ফিক্সড ডিপোজিট, বাঙালির চিরকালই ভরসা ব্যাঙ্কের ওপর। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির বাজারে আপনার কষ্টার্জিত আয়ের সঠিক মূল্য কি মিলছে?
বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গভর্নমেন্ট বন্ড বা সরকারি সিকিউরিটিজ। কেন এটি ব্যাঙ্কের এফডি-র থেকে ভালো বিকল্প, তা বুঝে নেওয়া জরুরি।
প্রথমেই আসে সুদের হারের কথা। সাধারণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো স্থায়ী আমানতে ৩ থেকে ৭.২৫ শতাংশ সুদ দিলেও সরকারি বন্ডে সুদের হার বর্তমানে ৭ থেকে ৭.৭৫ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। অর্থাৎ, হিসেব কষলে দেখা যাচ্ছে, প্রচলিত এফডি-র তুলনায় বন্ডে অন্তত ০.৫০ থেকে ১ শতাংশ বেশি মুনাফা লাভের সুযোগ থাকছে।
সুরক্ষার নিরিখে সরকারি বন্ডের কোনো বিকল্প নেই। একে বলা হয় ‘সভরেন গ্যারান্টি’ যুক্ত বিনিয়োগ। অর্থাৎ খোদ ভারত সরকার আপনার টাকার জামিনদার। ব্যাঙ্কে রাখা টাকা কেবল ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিমার আওতাভুক্ত থাকে। সহজ কথায়, ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হলে ৫ লক্ষের বেশি টাকা ফেরত পাওয়ার আইনি নিশ্চয়তা নেই, যা বন্ডের ক্ষেত্রে একেবারেই প্রযোজ্য নয়।
অনেকেই ভাবেন বন্ডে বিনিয়োগ মানেই টাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে যাওয়া। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। বন্ডের মেয়াদ ৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত হলেও প্রয়োজনে স্টক এক্সচেঞ্জে তা বিক্রি করে লিকুইড টাকা হাতে পাওয়া যায়। অন্য দিকে, মাঝপথে ব্যাঙ্কের এফডি ভাঙলে আমানতকারীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পেনাল্টি বা জরিমানা গুনতে হয়।
বিনিয়োগের অংকটা যদি ১০ লক্ষ টাকার নিরিখে ধরা হয়, তবে তফাতটা স্পষ্ট হবে। বার্ষিক ৭ শতাংশ হারে ব্যাঙ্কে আপনি পাবেন ৭০ হাজার টাকা সুদ। কিন্তু সরকারি বন্ডে সেই হার ৭.৫ শতাংশ হলেই ঘরে আসবে বছরে ৭৫ হাজার টাকা। প্রতি বছর ৫ হাজার টাকার এই বাড়তি লাভ দীর্ঘমেয়াদে বড় সঞ্চয় গড়তে সাহায্য করে।
ট্যাক্স বা করের ক্ষেত্রেও বন্ড ও এফডি-র চরিত্রে মিল আছে। দুই ক্ষেত্রেই অর্জিত সুদ আপনার বার্ষিক আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং কর কাঠামোর আওতায় পড়ে। তবে ব্যাঙ্কে নির্দিষ্ট সীমার বেশি সুদ হলে টিডিএস (TDS) কাটার ঝামেলা থাকে, যা বন্ডের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
আগে সরকারি বন্ড কেনা ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে তা জলভাত। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ‘রিটেইল ডাইরেক্ট’ পোর্টাল বা জিরোধা-গ্রো-র মতো জনপ্রিয় ডিম্যাট অ্যাপ ব্যবহার করে যে কেউ ঘরে বসেই এই বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। কোনও মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের প্রয়োজন নেই।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, আপনার মোট সঞ্চয়ের সবটা এক জায়গায় না রাখাই শ্রেয়। এফডি-তে লিকুইডিটি বা সহজে টাকা তোলার সুবিধা বেশি থাকলেও লাভের পাল্লা ভারী সরকারি বন্ডেই। তাই ঝুঁকিহীনভাবে বেশি আয়ের লক্ষে মধ্যবিত্তের পোর্টফোলিওতে সরকারি বন্ড থাকা এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬-এর এই টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজের পুঁজিকে সুরক্ষিত রাখতে হলে আধুনিক বিনিয়োগ পদ্ধতির সাহায্য নিতেই হবে। তাই ব্যাঙ্কে টাকা ফেলে না রেখে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করলে আগামীর পথে অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকা সম্ভব।