আক্ষরিক অর্থেই একটি গোটা রাজ্য জলের তলায়! হ্যাঁ, অসমের পরিস্থিতি বর্তমানেই এই রকমই। গোটা রাজ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ মানুষ বন্যাকবলিত। বন্যায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থা শিবসাগর ও চরাইদেও জেলার।
গোটা রাজ্যে জলের তলায় ৭৬৩ টিরও বেশি গ্রাম। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা চরাইদেও, যেখানে ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৪০৪ জন মানুষ বন্যাকবলিত। এরপর রয়েছে শিবসাগর (১ লক্ষ ৫৪ হাজার ৬৪ জন) এবং যোরহাট (১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৭৭৫ জন)। এছাড়া গোলাঘাট, হোজাই, কামরূপ, কামরূপ (মেট্রো), নগাঁও এবং ডিব্রুগড় জেলাও বন্যার কবলে রয়েছে।
ধনসিরি (দক্ষিণ) নদী নুমালীগড় এলাকায় এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। তবে কোনও নদীই সর্বোচ্চ বিপদসীমা অতিক্রম করেনি। বন্যায় ৪৮,৭৪২.০৯ হেক্টর কৃষিজমি জলের তলায় চলে গিয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৮,২৪০টি গবাদি পশু, আর বন্যার জলে ভেসে গিয়েছে ২৬,৫১২টি পশু-পাখি, যার মধ্যে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগিও রয়েছে।
রাজ্যজুড়ে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ জোরকদমে চলছে। প্রশাসন ৩৫৪টি ত্রাণ শিবির ও ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র খুলেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১০৯টি ত্রাণ শিবির এবং ২৪৫টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র। বর্তমানে ৩৭,৭২৪ জন ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন এবং ১ লক্ষ ৫৩ হাজার ৮৩৩ জন ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছেন।
সরকারি রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বন্যাজনিত ঘটনায় চরাইদেও জেলায় দু'জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কেউ নিখোঁজ নন। এছাড়া বন্যায় ৫৭৯টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, ১,৬১১টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১,০৪২টি গোয়ালঘর ও অন্যান্য পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উদ্ধারকাজে এসডিআরএফ (SDRF), এনডিআরএফ (NDRF), ভারতীয় সেনা, ভারতীয় বায়ুসেনা-সহ বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে। মোতায়েন করা হয়েছে ১৫২টি মেডিক্যাল টিম, ৩৬টি নৌকা এবং ২টি হেলিকপ্টার।
ত্রাণ হিসেবে ইতিমধ্যেই দুর্গতদের মধ্যে ৩,৩০২.৫৫ কুইন্টাল চাল, ৫৯০.৯৯ কুইন্টাল ডাল, ১৭৭.৩৮ কুইন্টাল লবণ, প্রায় ১৭,৭৩৬ লিটার সর্ষের তেল, পানীয় জল, ত্রিপল, হ্যালোজেন ট্যাবলেট, মশারি, স্যানিটারি ন্যাপকিন, শিশু খাদ্য, ব্লিচিং পাউডার-সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
বন্যার জেরে রাজ্যের ১০৫টি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত বা জলমগ্ন হয়েছে। বিশেষ করে শিবসাগর, চরাইদেও এবং যোরহাট জেলায় একাধিক সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। তবে সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, কোনও সেতু ভেঙে পড়া বা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি।
অসমের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানিয়েছেন জনপ্রিয় গায়ক পাপন। ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি বলেন, এ বছরের বন্যা অসমে প্রতি বছরের চেনা ছবিকেও ছাপিয়ে গিয়েছে।
গোটা গ্রামের পর গ্রাম জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে, বহু মানুষ এখনও গৃহহীন, বহু মানুষ নিখোঁজ এবং প্রাণহানির পাশাপাশি অসংখ্য গবাদি পশুও মারা গিয়েছে।ল ভিডিওটি শেয়ার করে পাপন লেখেন, 'আমার বন্ধু, সহকর্মী এবং যাঁদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তাঁরা যদি পারেন, অনুগ্রহ করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন।'
ভিডিও বার্তায় পাপন বলেন, অসমে প্রতি বছরই প্রবল বৃষ্টির কারণে বন্যা হয়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে তা কল্পনারও বাইরে। তাঁর কথায়, একের পর এক গ্রাম ভেসে গিয়েছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর। এখনও বহু মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই পাননি। বন্যায় অসংখ্য গবাদি পশুও মারা গিয়েছে।
অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (ASDMA) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫ লক্ষ ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষ এখনও বন্যার প্রভাবে রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দু'জনের মৃত্যু হওয়ায় চলতি বছরের বন্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৬৮-তে পৌঁছেছে।