
ঝকঝকে ক্রিকেট মাঠ কিংবা রুপোলি পর্দার চাকচিক্য নয়, এক শান্ত স্নিগ্ধ আধ্যাত্মিক মেজাজে ধরা দিলেন বিরাট কোহলি ও অনুষ্কা শর্মা। উত্তরপ্রদেশের বৃন্দাবনের গলিতে গলিতে যখন সূর্যের তেজ মধ্যগগনে, তখনই দেখা গেল এক বিরল দৃশ্য। কোনো বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা ভিআইপি নিরাপত্তা বেষ্টনীকে দূরে সরিয়ে রেখে সাধারণ ভক্তের মতোই ধুলোবালি মাখা রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটছেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই তারকা দম্পতি।
তাঁদের এই বৃন্দাবন সফরের ছবি ও ভিডিও সমাজমাধ্যমে আসতেই শোরগোল পড়ে গিয়েছে। নেই কোনো দেখনদারি, নেই কোনো আড়ম্বর। পরনে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি আর অনুষ্কার অঙ্গে সাধারণ সালোয়ার কামিজ। বৃন্দাবনের তপ্ত রোদে যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন খালি পায়েই বাঁকে বিহারীর ধামের গলি তছনছ করলেন বিরাট ও অনুষ্কা। এই দৃশ্য দেখে ভক্তদের একটাই কথা, ‘একেই বলে আসল সংস্কার’।
এই সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল শ্রী প্রেমানন্দ মহারাজ জির দর্শন। মহারাজের আশ্রমে পৌঁছে তাঁর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে দেখা গেল অনুষ্কাকে। ভক্তি আর শ্রদ্ধার এই নিবিড় মুহূর্তে তাঁদের দুজনকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, এঁরা বিশ্বখ্যাত আইকন। আশ্রমের সাধারণ নিয়ম মেনেই মাটিতে বসে মহারাজের বাণী শুনতে দেখা গেল এই দম্পতিকে।
সাধারণত বলিউড তারকা কিংবা ক্রিকেটারদের দর্শনের ক্ষেত্রে ‘ভিআইপি ট্রিটমেন্ট’ বা বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু বিরাট ও অনুষ্কা সেই পথে হাঁটলেন না। বরং সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে পরম শান্তিতে দর্শন সারলেন। আধ্যাত্মিকতার এই পথে তাঁরা নিজেদের তারকা পরিচয়টা যেন গেটের বাইরেই রেখে এসেছিলেন।
বিরাটের ভক্তরা বলছেন, ক্রিকেটের ময়দানে যে আগ্রাসন দেখা যায়, বৃন্দাবনের অলিতে গলিতে সেই বিরাটেরই এক শান্ত এবং সংযত রূপ ধরা পড়ল। অনুষ্কাও সবসময়ই তাঁর আধ্যাত্মিক ঝোঁকের জন্য পরিচিত। এর আগেও তাঁদের স্বামী নিম করোনি বাবার আশ্রমে যেতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবারের এই খালি পায়ে বৃন্দাবন ভ্রমণ যেন সব কিছুকে ছাপিয়ে গেল।
তপ্ত দুপুরে খালি পায়ে হাঁটা যে কতটা কষ্টসাধ্য, তা যে কেউ বুঝতে পারেন। কিন্তু বিরাট-অনুষ্কার চোখেমুখে সেই কষ্টের লেশমাত্র ছিল না। বরং এক অদ্ভুত শান্তি ও পরিতৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট ছিল তাঁদের চেহারায়। ভক্তদের সঙ্গে সেলফি তোলা বা অটোগ্রাফ দেওয়ার চেয়েও তাঁদের কাছে তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইষ্টদেবতার স্মরণ।
প্রেমানন্দ মহারাজের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় বিরাটের বিনয় নজর কেড়েছে সকলের। আশ্রমের রীতি অনুযায়ী যখন তাঁদের হাতে প্রসাদ তুলে দেওয়া হয়, তাঁরা পরম শ্রদ্ধায় তা গ্রহণ করেন। অনুষ্কার এই পা ছুঁয়ে প্রণাম করার ভঙ্গিটি নেটপাড়ায় প্রশংসার জোয়ার বইয়ে দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, আধুনিক শিক্ষা আর ঐতিহ্যের এমন মেলবন্ধন বিরল।
বৃন্দাবনের বাঁকে বিহারী মন্দির থেকে শুরু করে নিধিবন, সর্বত্রই তাঁদের উপস্থিতি মানুষের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভিড়কে তাঁরা বিরক্ত করেননি, বরং নিজেদের মতো করে ভক্তির আস্বাদ নিয়েছেন। নিরাপত্তারক্ষীরা থাকলেও তাঁরা খুব বেশি হস্তক্ষেপ করেননি, কারণ তারকারা নিজেরাই চেয়েছিলেন সাধারণের মতো থাকতে।
খেলার মরশুমের ব্যস্ততার মাঝেই নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে এই বিরতি বিরাটের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল বলে মনে করছেন তাঁর অনুরাগীরা। ক্রিকেটীয় চাপের ঊর্ধ্বে গিয়ে আধ্যাত্মিকতার শরণাপন্ন হওয়া বিরাটের মানসিক কাঠামোরই পরিচয় দেয়। আর অনুষ্কা তো সবসময়ই বিরাটের এই উত্তরণের সঙ্গী হিসেবে পাশে থেকেছেন।
তাঁদের এই সাধারণ মেজাজ দেখে বৃন্দাবনের স্থানীয় বাসিন্দারাও আপ্লুত। তাঁদের মতে, অনেক সময় বড় বড় সেলিব্রিটিরা এসে মন্দিরের শান্ত পরিবেশ নষ্ট করেন, কিন্তু বিরাট-অনুষ্কা একদম উল্টো। তাঁরা আসলেন, দেখলেন এবং ভক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিদায় নিলেন। তাঁদের এই আচরণ আগামীর তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি বড় শিক্ষা।
সব মিলিয়ে, বিলাসিতা ত্যাগ করে খালি পায়ে বৃন্দাবনের ধুলোয় পা রাখা বিরাট-অনুষ্কা আবারও প্রমাণ করলেন যে, প্রকৃত বড় হওয়া মানে বিনয়ী হওয়া। তারকা সুলভ আচরণ ঝেড়ে ফেলে মাটির মানুষের মতো ভক্তিভরে তাঁদের এই বৃন্দাবন পরিক্রমা দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।