মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির খবর। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তোলার জন্য আর মাসের পর মাস চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হবে না। এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (EPFO) তাদের পরিষেবায় এক যুগান্তকারী বদল এনেছে। এখন থেকে আবেদন করার মাত্র ৩ দিন বা ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ক্লেইম সেটলমেন্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মূলত ডিজিটাল পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করে সাধারণ মানুষের সঞ্চিত অর্থ তাঁদের হাতে দ্রুত পৌঁছে দিতেই এই বিশেষ উদ্যোগ।
নতুন নিয়মে ‘অটোমেটিক ক্লেইম সেটলমেন্ট’-এর পরিধি এক ধাক্কায় অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে কেবল চিকিৎসার জন্য অগ্রিম টাকা তোলার ক্ষেত্রে এই সুবিধা মিলত, এখন থেকে শিক্ষা, বিবাহ এবং গৃহ নির্মাণের মতো কাজের জন্যও এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি কার্যকর হবে। এর ফলে আবেদনকারীর নথিপত্র যদি যান্ত্রিকভাবে যাচাই হয়ে যায়, তবে কোনও আধিকারিকের হস্তক্ষেপ ছাড়াই টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এতে দুর্নীতির সুযোগ যেমন কমবে, তেমনই কমবে অহেতুক সময় নষ্ট।
চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বড় দুঃশ্চিন্তা দূর করল ইপিএফও। আগে এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থায় যোগ দিলে পুরনো পিএফ অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার করা ছিল এক পাহাড়প্রমাণ ঝক্কি। এখন থেকে চাকরি বদলালে আপনার পুরনো পিএফ ব্যালেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। এর জন্য গ্রাহককে আলাদা করে কোনও ফর্ম পূরণ বা আবেদন করতে হবে না। আধার লিঙ্কড ইউএএন (UAN) নম্বর থাকলেই এই প্রক্রিয়াটি ‘অটো-মোড’-এ সম্পন্ন হবে, যা লক্ষ লক্ষ বেসরকারি কর্মচারীর কাছে বড় পাওনা।
পেনশন ক্লেইমের ক্ষেত্রেও নিয়মে সরলীকরণ করা হয়েছে। আগে অবসরের পর পেনশনের টাকা পেতে যে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা পোহাতে হতো, তা অনেকটাই কমিয়ে আনা হয়েছে। নথিপত্রে কোনও গরমিল না থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গ্রাহকের পেনশন চালু করার নিশ্চয়তা দিচ্ছে পিএফ দপ্তর। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকদের কথা মাথায় রেখে ই-কেওয়াইসি (e-KYC) আপডেট করার পদ্ধতিটিকেও অনেক বেশি সহজবোধ্য করে তোলা হয়েছে।
ইপিএফও সূত্রে খবর, ক্লেইম রিজেকশন বা আবেদন বাতিল হওয়ার হার শূন্যে নামিয়ে আনতে একটি বিশেষ সফটওয়্যার লঞ্চ করা হয়েছে। অনেক সময় কেবল নাম বা জন্ম তারিখের সামান্য ভুলের জন্য গ্রাহকদের আবেদন ফেরত পাঠানো হতো। নতুন ব্যবস্থায় ভুল থাকলে তা আবেদন করার সময়ই গ্রাহককে সতর্ক করে দেওয়া হবে এবং তৎক্ষণাৎ সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে। এর ফলে রিজেকশন রেট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং পরিষেবা আরও স্বচ্ছ হবে।
২০২৬ সালের এই নতুন নিয়মাবলি আদতে ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পেরই একটি অংশ। পিএফ দপ্তর চাইছে গ্রাহকদের সরাসরি দপ্তরে আসার প্রয়োজন যেন না পড়ে। মোবাইল অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই সব কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে এই সমস্ত সুবিধার সুফল পেতে গ্রাহকদের অবশ্যই তাঁদের ইউএএন নম্বরের সঙ্গে আধার, প্যান এবং সক্রিয় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট (IFSC কোড সহ) লিঙ্ক রাখতে হবে। ডেটাবেস আপডেট না থাকলে এই দ্রুত পরিষেবা পাওয়া সম্ভব হবে না।
সামগ্রিকভাবে, ইপিএফও-র এই সংস্কার চাকরিজীবীদের ভবিষ্যতের সঞ্চয়কে আরও সুরক্ষিত এবং সহজলভ্য করে তুলল। পিএফ-এর টাকা যে আক্ষরিক অর্থেই বিপদের বন্ধু, তা এই দ্রুতগামী সেটলমেন্ট প্রক্রিয়াই প্রমাণ করে দিচ্ছে। প্রযুক্তির এই সুফল কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষ এবার অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁদের আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারবেন। দপ্তরের এই ইতিবাচক পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং কর্মজীবী মানুষ।