ইরান, ইজরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধের জেরে তেলের দাম যে ব্যাপক ভাবে বাড়তে চলেছে,তার ইঙ্গিত মোটামুটি স্পষ্ট। অশোধিত তেলের দাম যে হারে বাড়বে, তার খেসারত গুনতে হবে পেট্রোল, ডিজেল কিনতে। আবার জ্বালানির দাম বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বাড়বে। এই পরিস্থিতি একমাত্র রুখতে পারে ইরান।
কারণ, ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল ট্যাঙ্কার জাহাজ এই পথেই যাতায়াত করে। আর ইরান ঘোষণা করে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে একটিও তেলের ট্যাঙ্কার জাহাজ দেখা গেলে, তা আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে।
উপসাগরীয় এলাকায় এই সরু প্রণালী দিয়েই বিশ্বের মোট অশোধিত তেলের ২০ শতাংশ নিয়ে যাওয়া হয়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। ইরানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তেল। একই সঙ্গে বিরাট সম্পদ হল হরমুজ প্রণালী। এমন এক সমুদ্রপথ, যা বন্ধ রাখা মানে বিশ্বে অশোধিত তেলের দাম একেবারে আকাশছোঁয়া হতে পারে। শুধু ভারতেই নয়, জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে ভারত, চিন ও জাপান সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কারণ, এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই অশোধিত তেল ভারত, চিন, জাপান সহ বেশ কয়েকটি দেশে যায়।
হরমুজ প্রণালীটি উত্তর ইরান সংলগ্ন। দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। প্রায় ৫০ কিমি চওড়া। সবচেয়ে সরু এলাকাটি মাত্র ৩৩ কিমি চওড়া। আরব সাগরের সঙ্গে গাল্ফের সংযোগ এই প্রণালী। তবে এই প্রণালী খুবই গভীর। ফলে তেলের ট্যাঙ্কার অনায়াসেই চলাচল করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে যা তেল উত্পাদন হয়, তার বেশির ভাগই এই প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন হমুজ প্রণালী দিয়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অশোধিত তেল পাশ করানো হয়। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ভারতীয় মুদ্রায় ৫০ লক্ষ কোটি টাকার বাণিজ্য চলে এই প্রণালীতে।
শুধু ইরান নয়, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সহ সব গাল্ফ দেশেরই উত্পাদিত তেল এই প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছয়। প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজারের বেশি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে এই সরু প্রণালী দিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রণালী বন্ধ থাকা মানে বিশ্বে অশোধিত তেলের দাম মাত্রাতিরিক্ত বাড়বে। গত সপ্তাহের শেষে হরমুজ প্রণালীতে কম করে ৩টি জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, ইরানের হামার পর থেকে প্রায় দেড়শো জাহাজ আটকে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ইরান প্রতিদিন গড়ে ১.৭ বিলিয়ন ব্যারল তেল রফতানি করে। ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হওয়া আর্থিক বছরে ভারতীয় মুদ্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার তেল রফতানি করেছে ইরান। সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইরানের ডেটা বলছে, তেল থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় এটাই।
২০২২ সালে এশিয়ার দেশগুলিতে যে পরিমাণ অশোধিত তেল রফতানি করা হয়েছে,তার ৮২ শতাংশই হয়েছে এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান বিশ্ববাজারে যে পরিমাণ তেল রফতানি করে, তার ৯০ শতাংশই কেনে চিন।
ফলে ইরানের তেল চিনে না পৌঁছলে, চিনের বাজারে জিনিসের দাম আগুন হবে। চিনের বাণিজ্যে বড়সড় ক্ষতির আশঙ্কা। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বহু বছর ধরেই উপসাগরীয় তেল রফতানিকারক দেশগুলিকে বিকল্প রফতানি পথ গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছে। কারণ এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহণ হয়।
সৌদি আরব প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইন পরিচালনা করে, যা দৈনিক সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহণ করতে সক্ষম। প্রয়োজনে অতীতে তারা একটি প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনকেও সাময়িকভাবে তেল পরিবহণের কাজে ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আর আমিরশাহি তাদের অভ্যন্তরীণ তেলক্ষেত্রগুলিকে ওমান উপসাগরের তীরবর্তী ফুজাইরা বন্দরের সঙ্গে একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে যুক্ত করেছে। এই পাইপলাইনের দৈনিক পরিবহণ ক্ষমতা অন্তত ১৫ লক্ষ ব্যারেল।
এই বিকল্প পরিকাঠামোর মাধ্যমে তেল হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে রফতানি করা সম্ভব। তবে সংবাদসংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি সম্পূর্ণভাবে প্রণালী বন্ধ হয়ে যায় এবং কেবল এই বিকল্প পথ ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন (৮০ থেকে ১০০ লক্ষ) ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে।