ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত,চিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার জোট BRICS নিয়ে বহুবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। BRICS জোটে ইরান রয়েছে। রয়েছে মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও। ট্রাম্পের আশঙ্কা, মার্কিন ডলারকে সরিয়ে অন্য মুদ্রাকে বিশ্ব লেনদেনের একক মুদ্রা করার ষড়যন্ত্র করছে BRICS জোট। যাকে কূটনৈতিক ভাষায় বলা হচ্ছে, 'ডি-ডলারাইজেশন'। BRICS জোট ভাঙতে নানা কূটনৈতিক পদক্ষেপও করছে আমেরিকা। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ইরানকে যখন ইজরায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে হামলা করছে, তখন BRICS জোটের দেশগুলি চুপ।
বস্তুত, ২০২৫ সালে ডিসেম্বর থেকে যখন BRICS-এর চেয়ারম্যানশিপ ভারতের হাতে এসেছে, তখন থেকেই কিছু কূটনৈতিক বদল দেখা গিয়েছে। অনেক সমালোচকের বক্তব্য, নয়াদিল্লি ইজরায়েল ও আমেরিকার দিকে ঝুঁকেছে। ২০০৯ সালে ১১টি দেশ মিলে একটি অর্থনৈতিক জোট গড়েছিল, যার নাম BRICS। G7 গোষ্ঠীর বিকল্প হিসেবে তৈরি হয়েছিল এই জোট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, BRICS দেশগুলি আমেরিকা বিরোধী। যদিও BRICS-এর তরফে দাবি করা হয়, কোনও গোষ্ঠী বা জোটের সঙ্গে এই জোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে BRICS-এর কাজের পরিধি শুধু অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই, নিরাপত্তা বিষয়ও এর মধ্যে যোগ হয়েছে। এর ফলে সদস্য দেশগুলি যৌথ সামরিক মহড়া করতে শুরু করেছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক সেনা মহড়াটি এই বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকাতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে সেই মহড়ায় ভারত অংশগ্রহণ করেনি।
এখন প্রশ্ন হল, ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধে BRICS দেশগুলির কী প্রতিক্রিয়া? BRICS-এর সভাপতি এখন ভারত। কিন্তু ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলা নিয়ে এখনও সরাসরি কিছু মুখ খোলেনি নয়াদিল্লি। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, ভারত শান্তির পক্ষে ও শান্তি আলোচনার পক্ষে। তবে BRICS-এর তিন ফাউন্ডিং মেম্বার দেশ আলাদাভাবে বিবৃতি দিয়েছে।
সেই বিবৃতিতে তারা ইরানে যেসব মানুষ প্রিয়জন হারিয়েছে তাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের নিন্দা করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট বুধবার যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। রামাফোসা বলেন, 'আমরা যুদ্ধবিরতি চাই, আমরা চাই এই উন্মাদনা শেষ হোক। শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে হামলা করা ঠিক নয়।'
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ হামলার নিন্দা করেছেন। এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই হত্যার তীব্র নিন্দাও করেছেন। মস্কো ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক খুবই ভাল। এমনই শোনা যাচ্ছে, তেহরানকে অস্ত্র জোগান দিচ্ছে রাশিয়া। যদিও মস্কোর তরফে জানানো হয়েছে, আমেরিকা ও ইজরায়েলের যেটা চিন্তা, তেহরান পরমাণু অস্ত্র বানাচ্ছে, আসলে এমন কোনও তথ্য ও প্রমাণ নেই। গত শনিবার ইরানে যখন প্রথম হামলা চালায় ইজরায়েল ও আমেরিকা, মস্কোর নিন্দা জানিয়েছে বলে, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্যের উপর এই হামলা সামরিক আগ্রাসন।
যদিও রাশিয়ার বিরুদ্ধেই অভিযোগ, গত ৫ বছর ধরে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়্যাং ই মঙ্গলবার ফোনে ইজরায়েলের বিদেশমন্ত্রীকে বলেন, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা চলছিল, সেই সময়েই হামলা করা হল। ওই আলোচনায় ইজরায়েলের নিরাপত্তার বিষয় নিয়েও কথা চলছিল। তাহলে কেন হঠাত্ হামলা করা হল? ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনও সামরিক হামলার বিরোধিতা করছে চিন।
ভারত কী বলছে? ভারত এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে ইরান হামলার নিন্দা করেনি। তবে খামেনেইয়ের মৃত্যুতে শোকবার্তা সই করেছে বিদেশমন্ত্রক। মোদী সরকারের তরফে বলা হয়েছে, 'আলোচনা ও কূটনৈতিক পথেই সমাধান খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পক্ষে ভারত।' প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রতিটি গাল্ফ দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে ফোন করেছেন। সেখানে বসবাসকারী ভারতীয়দের সুরক্ষার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।
যদিও মোদী সরকারের এই অবস্থানের সমালোচনায় সরব হয়েছে বিরোধী দল কংগ্রেস। যুদ্ধের ঠিক আগে মোদীর ইজরায়েল সফরের নিন্দা করেছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের অভিযোগ, যুদ্ধের ঠিক মুখে মোদীর জেরুজালেম সফর আসলে যুদ্ধে সমর্থনের কৌশলগত পদক্ষেপ।
গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েল সফরে গিয়ে মোদী বলেছিলেন, 'ভারত ইজরায়েলের পাশে রয়েছে। বর্তমানে ও ভবিষ্যতেও।' একাধিক ব্যবসায়িক চুক্তিতেও সই করেছেন মোদী ও নেতানিয়াহু। ভারতে ৪০ শতাংশ অস্ত্র রফতানি করছে ইজরায়েল।
ভারতকে কি চাপ দিচ্ছে আমেরিকা? ভারত দীর্ঘদিন ধরে স্ট্র্যাটেজিক অটোনমির নীতি অনুসরণ করে আসছে। এর ফলে ভারত একদিকে যেমন পশ্চিমি দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে, তেমনই পশ্চিমি দেশগুলির চোখে বিতর্কিত বা একঘরে বলে বিবেচিত দেশ, যেমন রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করতে পারে। এই নীতিই ভারতের BRICS-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ার অন্যতম কারণ। গত বছর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার তেল কেনা চালিয়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের উত্তেজনা তৈরি হয়। এর জেরে ২০২৫ সালের অগাস্টে ট্রাম্প ভারতের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি ট্যারিফ চাপিয়ে দেন। ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার আমেরিকা হলেও নয়াদিল্লি এই অতিরিক্ত ট্যারিফকে 'অন্যায্য, অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য' বলে আখ্যা দেয়। ফেব্রুয়ারির মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়। আলোচনার পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভারতের সঙ্গে একটি ডিল হয়েছে, যার ফলে ট্যারিফ কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানো হবে। ট্রাম্পের দাবি ছিল, রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে হবে দিল্লিকে এবং তার পরিবর্তে আমেরিকার তেল ও অন্যান্য পণ্য বেশি পরিমাণে কিনতে হবে।