
অসম নির্বাচন ২০২৬: নাম বদলে কতটা এগিয়ে রামকৃষ্ণ নগর
বরাক উপত্যকার রাজনীতিতে চুপিসারে বড় বদল এনে দিয়েছে একটি নাম—রতাবাড়ি এখন রামকৃষ্ণ নগর। ২০২৩ সালের ডিলিমিটেশন শুধু নাম পাল্টায়নি, বদলে দিয়েছে ভোটের অঙ্কও। শ্রীভূমি জেলা (পুরনো করিমগঞ্জ) জুড়ে বিস্তৃত এই তপসিলি জাতি সংরক্ষিত কেন্দ্র এখন কার্যত নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষাগার, যেখানে পুরনো হিসেব আর খাটে না।
রামকৃষ্ণ নগর—স্থানীয়দের কাছে আরকে নগর—প্রায় ২৮০-২৮৬টি গ্রামের সমষ্টি, একেবারে গ্রামীণ জনপদ। শহুরে ভোটার কার্যত নেই বললেই চলে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, বাঙালি ভাষাভাষী জনসংখ্যা, চা-বাগানের শ্রমিক এবং বরাক উপত্যকার চেনা মিশ্র জনবিন্যাস—এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক মেরুদণ্ড।
১৯৬২ সালে রতাবাড়ি হিসেবে যাত্রা শুরু। ত...
অসম নির্বাচন ২০২৬: নাম বদলে কতটা এগিয়ে রামকৃষ্ণ নগর
বরাক উপত্যকার রাজনীতিতে চুপিসারে বড় বদল এনে দিয়েছে একটি নাম—রতাবাড়ি এখন রামকৃষ্ণ নগর। ২০২৩ সালের ডিলিমিটেশন শুধু নাম পাল্টায়নি, বদলে দিয়েছে ভোটের অঙ্কও। শ্রীভূমি জেলা (পুরনো করিমগঞ্জ) জুড়ে বিস্তৃত এই তপসিলি জাতি সংরক্ষিত কেন্দ্র এখন কার্যত নতুন রাজনৈতিক পরীক্ষাগার, যেখানে পুরনো হিসেব আর খাটে না।
রামকৃষ্ণ নগর—স্থানীয়দের কাছে আরকে নগর—প্রায় ২৮০-২৮৬টি গ্রামের সমষ্টি, একেবারে গ্রামীণ জনপদ। শহুরে ভোটার কার্যত নেই বললেই চলে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, বাঙালি ভাষাভাষী জনসংখ্যা, চা-বাগানের শ্রমিক এবং বরাক উপত্যকার চেনা মিশ্র জনবিন্যাস—এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক মেরুদণ্ড।
১৯৬২ সালে রতাবাড়ি হিসেবে যাত্রা শুরু। তারপর ১৫টি বিধানসভা নির্বাচন, তার মধ্যে ২০০৩ ও ২০১৯—দুটি উপনির্বাচন। শুরুতে কংগ্রেসের একচেটিয়া প্রভাব থাকলেও গত দুই দশকে বিজেপির উত্থান ক্রমশ সেই জমি কেড়ে নিয়েছে। পরিসংখ্যান নির্মম—কংগ্রেস ৭ বার, বিজেপি ৬ বার। বাকি দু’বার নির্দল ও জনতা পার্টি।
২০১১-তে কংগ্রেসের কৃপানাথ মল্ল ১২,৪২৯ ভোটে বিজেপির নিখিল শুক্লবৈদ্যকে হারান। কিন্তু সেই মল্লই ২০১৬-তে দলবদল করে বিজেপির টিকিটে লড়ে ২৪,৫২৬ ভোটে জয় এনে দেন গেরুয়া শিবিরকে। এরপর ২০১৯-এর উপনির্বাচনে বিজেপির বিজয় মালাকার প্রায় একই ব্যবধানে—২৪,০০১ ভোটে—কংগ্রেসকে হারান। ২০২১-এ ব্যবধান আরও বেড়ে ৩৬,২২১। অর্থাৎ, বিজেপির গ্রাফ শুধু উঠেছে, থামেনি।
লোকসভা ভোটের ট্রেন্ড আরও স্পষ্ট বার্তা দেয়। ২০০৯-এ কংগ্রেস ১৩,৯৪৫ ভোটে এগিয়ে ছিল। ২০১৪-তে বিজেপি পাল্টা ১২,২৫৮ ভোটে লিড নেয়। ২০১৯-এ ৪২,৮১৩ ভোটে এআইইউডিএফ-কে হারিয়ে বিজেপি প্রায় একতরফা আধিপত্য দেখায়, কংগ্রেস তখন তৃতীয়। তবে ২০২৪-এ ছবিতে ফাটল—ডিলিমিটেশনের পর কংগ্রেস ব্যবধান কমিয়ে আনে মাত্র ৪,৩৭২ ভোটে। সংখ্যার অঙ্কও বদলেছে নাটকীয়ভাবে। ২০২৬-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ২,১৬,৩৯৬ জন ভোটার—২০২৪-এর তুলনায় ৪,৫২২ বেশি। ২০২৩-এর ডিলিমিটেশনে ১,৭২,২৭৭ ভোটারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ৩৯,৫৯৭ জন। তার আগে ২০১৯-এ ছিল ১,৫৯,৩১৫, ২০১৬-তে ১,৪৮,১০৫, আর ২০১১-তে ১,৩৭,৬৯৯। অর্থাৎ, কেন্দ্রটি শুধু রাজনৈতিক নয়, সংখ্যাতাত্ত্বিক দিক থেকেও দ্রুত পরিবর্তিত।
ডিলিমিটেশনের আগে রতাবাড়িতে মুসলিম ভোটার ছিল ৩৬.৭০ শতাংশ, তপসিলি জাতি প্রায় ১৮ শতাংশ। নতুন রামকৃষ্ণ নগরে এই সমীকরণ বদলেছে বলেই ধারণা—মুসলিম প্রভাব কিছুটা কমেছে, তপসিলি জাতি ও অন্যান্য গোষ্ঠীর অনুপাত বেড়েছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও সামনে আসেনি, তবু রাজনৈতিক শিবিরগুলির কৌশল বলছে—ভোটের মেরুকরণ আগের মতো নেই। ভোটদানের হারও এই কেন্দ্রের নীরব বার্তা বহন করে। ২০১১-তে ৬০.১৩ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ২০১৬-তে ৭৭.৯৪, ২০১৯-এ ৭৯.১৭, ২০২১-এ ৭৮.৮৫ এবং ২০২৪-এ সর্বোচ্চ ৮১.১৩ শতাংশ। অর্থাৎ, আগ্রহ বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে প্রতিযোগিতাও।
ভূগোলের ছবিও স্পষ্ট—ছোট পাহাড়, ঢেউ খেলানো জমি, উর্বর সমতল। ধানচাষ, চা-বাগান, ছোট ব্যবসা—এই কেন্দ্রের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। কিন্তু লংগাই, কুশিয়ারা, সিংলার মতো নদীর কারণে প্রতি বর্ষায় বন্যার আশঙ্কা থেকে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থায় সড়কপথ থাকলেও রেল পরিষেবা নির্ভর করে করিমগঞ্জ বা বদরপুর স্টেশনের উপর, যা ৩০-৫০ কিমি দূরে। জেলার সদর শ্রীভূমি প্রায় ৪৭ কিমি দূরে। পাশেই পাথারকান্দি (১৫ কিমি), হাইলাকান্দি (১৮ কিমি)। আর আন্তর্জাতিক সীমানা—বাংলাদেশ—এই কেন্দ্রের রাজনীতিতে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, বাণিজ্য থেকে জনবিন্যাস—সব ক্ষেত্রেই যার প্রভাব।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ডিলিমিটেশন কাকে সুবিধা দিল? একথা বলার সুযোগ নেই যে বিজেপি নিজেদের সুবিধামতো সীমা টেনেছে। কারণ, রতাবাড়িতেই তারা শক্তিশালী ছিল। বরং নতুন সীমানা কংগ্রেসকে অক্সিজেন দিয়েছে—২০২৪-এর ফল তার প্রমাণ। তার উপর কংগ্রেসের চাল—সুরুচি রায়। তরুণ, মূলধারার রাজনীতিতে নতুন, কিন্তু বরাক উপত্যকার মাটিতে কাজ করা সামাজিক কর্মী হিসেবে পরিচিত। এই প্রার্থী বাছাই বিজেপিকে অন্তত অস্বস্তিতে ফেলেছে, তা স্পষ্ট।
তাই ২০২৬-এ রামকৃষ্ণ নগর আর ‘সেফ সিট’ নয়। বিজেপি এগিয়ে—কিন্তু ব্যবধান আর নিশ্চিন্ত নয়। কংগ্রেস পিছিয়ে—কিন্তু লড়াই থেকে ছিটকে নয়। এই কেন্দ্র এখন অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে ফল নির্ধারণ করবে বদলে যাওয়া জনসংখ্যা, নতুন সীমানা, আর মাটির রাজনীতির আসল পরীক্ষা।
Input by- Ajay Jha