শান্তিনিকেতনের একতারা ও আলপনা
বাউলদের হাতে থাকা একতারার সুর মুগ্ধ করেনি এমন মানুষ নেহাতই কম। শান্তিনিকেতনের অলিতে-গলিতে এই একতারায় সুর তোলা বাউলদের দেখা মেলে। অপরদিকে, বিভিন্ন পুজো-পার্বনে আলপনা দেওয়ার রীতি সেই কবে থেকে। উভয়ই বাংলার লোক ঐতিহ্যের প্রতীক এবং বৃহৎ পরিসরে এই দুটি জিনিসের খবর সকলেই রাখেন। দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইনের রিপোর্ট অনুযায়া, পশ্চিমবঙ্গ জাতীয় জুরিডিকাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (WBNUJS) ২০২৩ সালে উভয়ের জন্য GI ট্যাগের জন্য আবেদন করেছিল।
জনাইয়ের মনোহরা
ছানার সঙ্গে চিনি, এলাচ মিশিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। ঠাণ্ডা হলে গোল্লা পাকিয়ে তাতে মেশানো হয় পেস্তার গুঁড়ো। তারপর চিনি মেশানো ঘন দুধে গোল্লা একবার ডুবিয়েই তুলে নিলে তৈরি মনোহরা। হুগলি জেলার মনোহরার ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। ২০২২ সাল থেকে জনাইয়ের বাসিন্দারা চাইছেন তাঁদের এই স্থানীয় মিষ্টি জিআই স্বীকৃতি পাক।
বেলিয়াতোড়ের মেচা সন্দেশ
বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের মেচা সন্দেশ যে না খেয়েছে সে এই মিষ্টি স্বাদ বুঝবেন না। কোনও দুধ বা ছানা ছাড়াই তৈরি করা হয় মেচা সন্দেশ। শুধু বাঁকুড়া নয়, বাংলা জুড়েই বিখ্যাত এই সন্দেশ। তবে এর আদি উৎপত্তিস্থল বেলিয়াতোড়ে সাকুল্যে কুড়িটি পরিবার তৈরি করে এই সন্দেশ। দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে বেলিয়াতোড় মেচা সন্দেশ ব্যবসায়ী সমিতি জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছিলেন।
হাটগ্রামের শঙ্খ-শিল্প
হাটগ্রাম জনপ্রিয় তার শঙ্খ ও শাঁখের তৈরি গয়নার জন্য। এই শিল্পের উচ্চ দক্ষতা প্রয়োজন এবং এর গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। জিআই স্বীকৃতি পেলে এই শিল্পের কারিগররা অনেকটাই সুরক্ষিত হবে এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প হিসাবে পরিচিতি লাভ করবে। হাটগ্রাম শঙ্খ বণিক কল্যাণ সমিতি ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ তারিখে আবেদনটি করেছিল।
আশাপুর ও নবাবগঞ্জের বেগুন
আশাপুর ও নবাবগঞ্জের দুই জায়গার বেগুনের স্বাদ, আকার ও স্থানীয়ভাবে যে মাটিতে বেগুন ফলন হয় তার জন্য বিখ্যাত। গ্রামীণ বাংলায় রন্ধনসম্পর্কীয় এবং কৃষিক্ষেত্রে এর গুরুত্ব রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে জিআই স্বীকৃতি পরীক্ষাধীন রয়েছে এবং একবার গৃহীত হলে, এটি কৃষকদের সহায়তা করবে এবং টেকসই চাষাবাদ অনুশীলনকে উৎসাহিত করবে।
শক্তিগড়ের ল্যাংচা
দিঘা-মন্দারমণি যাওয়ার পথে শক্তিগড়ে নেমে ল্যাংচার স্বাদ নেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। এই শক্তিগড়ের ল্যাংচা স্বাদে ও আকারে অতুলনীয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পূর্ব বর্ধমান প্রশাসনকে এই মিষ্টিটিকে জিআই ট্যাগ পাওয়ার আবেদন করার জন্য বলেছেন।
কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া
প্রায় পাঁচশো বছর জুড়েই তার সগৌরব অবস্থান। কৃষ্ণনগরের নানা পরিচয়ের মধ্যে সরপুরিয়া, সরভাজার শহর পরিচয়টি অন্যতম। এহেন সরপুরিয়া ও সরভাজার জন্য ভারত সরকারের ‘জি আই’ স্বীকৃতির দাবি দীর্ঘ দিন ধরে করে আসছেন শহরের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা। ২০১৭ সালে আবেদন করলে তা ২০১৯ সালে খারিজ করে দেওয়া হয়।
রানাঘাটের পান্তুয়া
গোটা বাংলা জুড়েই রয়েছেন পান্তুয়া প্রেমীরা আর তাঁরা সকলেই জানেন রানাঘাটের পান্তুয়ার স্বাদ অন্য কোথাও পাওয়া মুশকিল। এই মিষ্টিটিও এখনও জিআই স্বীকৃতি পায়নি, তবে এটি পেলে রানাঘাটের মিষ্টি প্রস্তুতকারকদের যথাযথ স্বীকৃতি মিলবে।
মগরাহাটের রুপো শিল্প
মগরাহাটের ছোট-বড় রুপো শিল্পীরা বংশ পরম্পরায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের নকশায় বাংলার শৈল্পিকতা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়। এই শিল্প ও শিল্পীরা যাতে আগামী দিনে হারিয়ে না যায় এবং স্থানীয় কারিগরদের জীবনকে উন্নত করতে জিআই ট্যাগের জন্য আবেদন করেছে রাজ্য।
বর্ধমানের নতুনগ্রামের পুতুল
পূর্ব বর্ধমান জেলার গর্বের শিল্প পূর্বস্থলীর নতুনগ্রামের কাঠের পুতুলের ‘জিআই’ বা ‘জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন’ তকমা পাওয়ার কাজ কিছুটা এগিয়েছে। তবে সেটা ২০২২ সালে। জেলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রায় দেড়শো বছর ধরে জড়িয়ে রয়েছে নতুনগ্রামের কাঠের পুতুল। শিল্পীদের তৈরি পেঁচা, রাজারানি ও গৌর-নিতাইয়ের বেশ সুনাম রয়েছে। ২০২২ সাল থেকেই এই শিল্প অপেক্ষা করছে GI তকমা।