ফুটবল বিশ্বে জাদুকরদের আবির্ভাব হয় কালের নিয়মে। তারপর অবসর হয়। ফের আরেক জাদুকরের দিকে তাকায় বিশ্ব। লিওনেল মেসি সেই জাদুকরদেরই একজন। দিয়েগো মারাদোনার পরে আর্জেন্টিনা মেসি নামক এক জাদুকরকে উপহার দিয়েছিল। মারাদোনার পরে যে খরা দেখা দিয়েছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলে, সেই খরায় মরুদ্যানের মতো স্বস্তি দিয়েছিল মেসি। যাঁকে আদর করে অনেকে LM10 বলে ডাকেন। মঙ্গলবার রাত ছিল বিষাদের রাত। লিওনেল মেসি নামক ফুটবল জাদুকরের ফেয়ারওয়েল ম্যাচ। আর্জেন্টিনার কাছে ঐতিহাসিক দিন। মেসিকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে রাজকীয় বিদায় জানাল আর্জেন্টিনা। গোটা বিশ্ব দেখল, সুপার হিরো কাকে বলে!
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়া আর্জেন্টিনার তারকা অ্যাঞ্জেল দি মারিয়াকেও দলের সঙ্গে দেখা গেল। গত কোপা আমেরিকার পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন তিনি। তবে এবার তিনি প্লেয়ার হিসেবে নয়, দলের পাশে উপস্থিত ছিলেন। গ্যালারিতেও ছিল একাধিক পরিচিত মুখ। কিংবদন্তি ফরাসি স্ট্রাইকার ডেভিড ত্রেজেগেকে মেয়ের সঙ্গে গ্যালারিতে বসে মেসির ম্যাচের আগে ওয়ার্ম-আপ দেখলেন।
বেনিনের বিরুদ্ধে মেসির এই ফেয়ারওয়েল ম্যাচে স্টেডিয়ামে জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখা গেল, ১০ নম্বর জার্সি ফুটে উঠেছে। গোটা স্টেডিয়ামে নীল-সাদা রং। ফুটবল বিশ্বের কাছে মঙ্গলবারের রাত ছিল স্বপ্নের মতো। মেসি যদি ফুটবলের রাজপুত্র হন, তা হলে আর্জেন্টিনা তাঁকে যে ভাবে বিদায় জানাল, তাকে রূপকথার মতো বলাই যায়।
এরপর মাঠে পা রাখলেন মেসি। জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় মেসির তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও এবং চিরো তাঁকে সঙ্গে করে মাঠে নামতেই মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম চত্বরজুড়ে আতশবাজি ফেটে পড়ল। আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন আবেগে চোখে জল ধরে রাখতে পারলেন না মেসি। আবেগ সামলাতে পারেননি কোচ লিওনেল স্কালোনিও। অধিনায়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিকোলাস ওতামেন্দি, তাঁর মুখেও স্পষ্ট ছিল এই বিশেষ মুহূর্তের আবেগ।
টসের আগে বেনিনের অধিনায়ক মেসির হাতে একটি বিশেষ স্মারক তুলে দেন। সেটি দেখতে অনেকটা আমাজনীয় ঘরানার একটি ভাস্কর্যের মতো। এর সঙ্গে ছিল একটি চিঠিও। এরপর অবশেষে শুরু হল আসল ফুটবল। ফেয়ারওয়েল ম্যাচকেও হালকা ভাবে নিলেন না মেসি। সেরাটা দিলেন। যতবার মেসির পায়ে বল গেল, গোটা স্টেডিয়ামে চিত্কার। মেসিকে এ দিন কোনওভাবেই তাড়াহুড়ো করে ছুটতে দেখা যায়নি। সেই চেনা ছন্দেই মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি, হেঁটে হেঁটে জায়গা খুঁজছিলেন, পাস দেওয়ার পথ তৈরি করছিলেন এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, কখন কোনও মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেবেন।
তবে সেই সুযোগের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। সপ্তম মিনিটেই বক্সের বাইরে দ্রুত ওয়ান-টু পাস খেলেন মেসি। এরপর গোলের দিকে ঘুরে বক্সের ঠিক বাইরে থেকে শট নেন তিনি। তবে বেনিনের গোলরক্ষক সেই শট সামলে নেন। ফলে ম্যাচে মেসির প্রথম অন-টার্গেট শটটি গোল হয়নি।
মিনিট তিনেক পরেই আবার স্টেডিয়ামে চিত্কার। ১০ মিনিটের মাথায় মেসির কৃতিত্বকে সম্মান জানাতে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্যে সামিল হন মাঠের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সমর্থকরা। ফের আতশবাজির আলোয় ঝলমল করে ওঠে স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে সম্মান জানাতে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে থাকেন গ্যালারিতে থাকা সমর্থকেরা।
তবে সমর্থকদের চাওয়া ছিল আরও একটি মুহূর্ত, তাঁরা দেখতে চেয়েছিলেন মেসির গোল। ২৩ মিনিটের মাথায় মেসি যতবারই বক্সের দিকে এগোচ্ছিলেন, ততবারই গ্যালারিতে উত্তেজনা বাড়ছিল। এক সময় বক্সের মধ্যে দ্রুত ঢুকে পড়ে গোল করার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ঠিকমতো ফিনিশিং করতে পারেননি মেসি।
আর্জেন্টিনাই বল দখলে রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল। তবে সেই নিয়ন্ত্রণকে গোলের সুযোগে পরিণত করতে পারেনি তারা। আয়োজক দলের আক্রমণাত্মক চাপ সামলে বেনিনও বেশ ভালোভাবেই নিজেদের রক্ষণ ধরে রেখেছিল। ফলে প্রথমার্ধের শেষ পর্যন্ত দুই দলের মধ্যে ব্যবধান খুব একটা তৈরি হয়নি। গোলশূন্য অবস্থাতেই শেষ হয় প্রথমার্ধ। এরপর কিছুক্ষণের জন্য মাঠের ফুটবল থেকে নজর সরে যায়, দর্শকদের মনোরঞ্জনে পারফর্ম করেন ‘লস ফান্ডামেন্তালিস্তাস’।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই আর সময় নষ্ট করেনি আর্জেন্টিনা। ফের আক্রমণের নেপথ্যে ছিলেন মেসি। বিপজ্জনক জায়গায় নিখুঁত ক্রস বাড়িয়ে দেন তিনি। সেই বল থেকেই দারুণ ফিনিশ করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। ওতামেন্দির জন্য মুহূর্তটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যের। কারণ জাতীয় দলের হয়ে এটিই ছিল তাঁর শেষ ম্যাচ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। মাঠ ছাড়ার সময় জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের শেষ অবদানটুকুও রেখে গেলেন তিনি।
এরপর ফ্রি-কিক থেকে নিজের নাম স্কোরশিটে তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। সুযোগ তৈরি হয়েছিল, গ্যালারিও প্রস্তুত ছিল সেই মুহূর্তের জন্য। কিন্তু মেসির শট লক্ষ্যে পৌঁছয়নি। তবে দ্বিতীয় গোলের জন্য আর্জেন্টিনাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। এ বার সেই মুহূর্ত তৈরি করেন নিকো পাজ। ডান দিক থেকে বল পেয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েন তিনি। এরপর বাঁকানো শটে বল জালে জড়িয়ে দেন পাজ। তাঁর সেই দুর্দান্ত ফিনিশে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল মেসির কেরিয়ারে অসংখ্যবার দেখা সেই চেনা গোলের ছায়া।
এই মুহূর্তের প্রতীকী তাৎপর্যও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা যাঁদের ঘিরে, নিকো পাজ তাঁদের অন্যতম। ভবিষ্যতে তিনিই মেসির ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি হতে পারেন এবং আলবিসেলেস্তেদের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করা হয়। কিন্তু এই রাতটা ছিল মেসিরই।
সবচেয়ে বড় মুহূর্তটি আসে ৬৯ মিনিটে। বক্সের মধ্যে অগুস্তিন এনদিয়ায়ে ফাউলের শিকার হন এবং পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। সঙ্গে সঙ্গেই মেসিকে ঘিরে ফেলেন তাঁর সতীর্থরা। মনে হচ্ছিল, যেন তাঁরা পেনাল্টি নিতে যাওয়া সতীর্থকে আগলে রাখছেন,যেমনটা দেখা যায় কোনও হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে। কে পেনাল্টি নেবেন, তা নিয়ে অবশ্য কোনও প্রশ্নই ছিল না। বলটি স্পটের উপর রেখে দাঁড়ালেন মেসি। অপেক্ষায় গোটা মনুমেন্টাল। তারপর মেসি যা করার, করে দিলেন। দুরন্ত শটে বল জালের ডানদিকের উপরের কোণে পাঠিয়ে দিলেন তিনি। গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। গোলের পর মুহূর্তেই সতীর্থরা ছুটে এসে অধিনায়ককে ঘিরে ফেলেন। তাঁকে ঘিরেই শুরু হয় উচ্ছ্বাস।
মেসি পেলেন তাঁর বিদায়ী গোল। সতীর্থদের তাঁকে ঘিরে উল্লাস করার সেই ছবিটিই হয়তো এই রাতের জন্য সবচেয়ে মানানসই উদ্যাপন। কারণ এটি আর শুধুমাত্র স্কোরলাইনের বিষয় ছিল না। প্রায় দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার ফুটবলকে যিনি গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন, তাঁর কেরিয়ারের শেষ অধ্যায় উদ্যাপন করছিলেন তাঁর সতীর্থরাই।
তবে বিদায়ের আবহ পুরোপুরি চেপে বসলেও মেসির প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতায় কোনও বদল আসেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বল মাঠের বাইরে চলে যাওয়া আটকাতে ডানদিকের কর্নারের দিকে ছুটে যান তিনি। কেরিয়ারের দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের যে পরিচিত তীব্রতা দিয়ে ত্রস্ত করেছেন, সেই আগ্রাসনই যেন আবার দেখা গেল। দ্বিতীয় গোল করার সোনার সুযোগও পেয়েছিলেন মেসি। নিকো গঞ্জালেস নিচু করে নিখুঁত ক্রস বাড়িয়ে দেন তাঁর দিকে। একেবারে কাছ থেকে গোল করার সুযোগ ছিল আর্জেন্টিনার অধিনায়কের সামনে। কিন্তু এবার আর ফিনিশিং হল না।
দুর্বল পা দিয়ে শট নিতে গিয়ে বল ঠিকমতো মারতে পারেননি মেসি। তাঁর মতো অসাধারণ এক খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রেও এমন সুযোগ সাধারণত নিশ্চিত গোল হিসেবেই ধরা হয়। তখন ম্যাচের আর প্রায় ১০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময় বাকি। ধীরে ধীরে উপলব্ধি হচ্ছিল, শেষটা এগিয়ে আসছে। তবু মেসি এমনভাবেই খেলছিলেন, যেন সামনে আরও একটি ম্যাচ অপেক্ষা করছে। একের পর এক সতীর্থকে পাস বাড়াচ্ছিলেন, গোলের সুযোগ তৈরি করছিলেন এবং বিপজ্জনক জায়গায় বল পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ সেগুলিকে গোলে পরিণত করতে পারছিল না। আরও একটি সুযোগ এসেছিল, যখন মেসির একটি শট গোলরক্ষকের গায়ে লেগে পোস্টে গিয়ে ধাক্কা খায়।
কিন্তু তখন সময়ই মেসির বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত প্রায় আসন্ন। আর সেই সঙ্গে গান ধরতে শুরু করে মনুমেন্টাল। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা জানতেন কী আসতে চলেছে। জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির শেষ মুহূর্তগুলি যত এগিয়ে আসছিল, ততই গলা বাড়িয়ে গান ধরছিলেন তাঁরা।
এরপর এল আরও একটি শেষ সুযোগ। ম্যাচের একেবারে শেষ বাঁশির আগে গোল থেকে প্রায় ২১ মিটার দূরে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। গোটা স্টেডিয়ামে একের পর এক মোবাইল ফোনের ক্যামেরা জ্বলে উঠল। প্রত্যাশার ছবিটা ছিল একেবারে স্পষ্ট। সেট-পিস থেকে কেরিয়ারে এত অসংখ্য জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন মেসি যে, মনে হচ্ছিল এটাই হয়তো শেষবারের মতো তাঁর স্বাক্ষর রেখে যাওয়ার আদর্শ সুযোগ। কিন্তু তা আর হল না। মেসির শট গোলের উপর দিয়ে বাইরে চলে গেল।
নিখুঁত কোনও সমাপ্তি হল না। শেষ ফ্রি-কিক বাঁক খেয়ে জালে ঢুকল না, শেষ মুহূর্তে এল না কোনও অবিশ্বাস্য মাস্টারপিসও। আর্জেন্টিনাকে মেসি ইতিমধ্যেই সবকিছু দিয়ে দিয়েছেন। বিদায়ের এই রাতে ছেলেদের হাত ধরে মনুমেন্টালের মাঠে নেমেছেন, জাতীয় সঙ্গীতের সময় চোখের জল সামলেছেন, গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, নিজে গোল করেছেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আরও একটি গোলের সন্ধান করে গিয়েছেন।
অবশেষে বেজে উঠল শেষ বাঁশি। আতশবাজি, ১০ নম্বর জার্সি, চোখের জল, গোল আর গ্যালারির গান, সব মিলিয়ে তৈরি হল এক আশ্চর্য রাত। শেষবারের মতো মনুমেন্টালে আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামলেন লিওনেল মেসি।